একটি বার্গারের গল্প...

গল্প নং: (০৪)
নামঃ একটি বার্গারের গল্প...
-
- মতিন কি খুব ব্যস্ত নাকী? একটু কথা বলা যাবে?

মতিন সাহেব বড় স্যারের রিপোর্ট তৈরি করছিলেন। হঠাৎ প্রশ্ন শুনে তিনি মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন। দেখেন,রিসার্চ ডিভিশনের হেড দিলীপ স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন।

- স্যার, আপনি? আমাকে ডাক দিতেন। আমি যেতাম আপনার কাছে। কোনো কিছু করতে হবে?

- মতিন। বসো।অনেকক্ষণ চেয়ারে বসে কাজ করছিলাম। কোমর ধরে গেছে তাই একটু হাঁটা হাটি করছিলাম। রিপোর্টের কি অবস্থা? আজকে শেষ করতে পারবে?

- স্যার, আশা রাখি হয়ে যাবে। সেটা নিয়ে কাজ করছি। মোটামুটি ৭০ ভাগ কাজ শেষ করে ফেলছি। ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

- অফিস শেষ হওয়ার পর তোমার কি কোনো কাজ আছে?

- না স্যার। কিছু করতে হবে?

- আরে না। ছোটো মেয়েটা ভার্সিটিতে সুযোগ পেয়েছে।এইমাত্র ফোন করে জানালো। তাই ভাবছিলাম, আমরা যারা এক গাড়ীতে করে যাই, তাদের সবাইকে অফিস শেষে নাস্তা করাবো। তাই তোমার কাছে জানতে আসলাম, অফিস শেষে তোমার কোনো কাজ আছে নাকী?

- তেমন কোনো কাজ নেই।

- ঠিক আছে। কাজ করো। তোমার ছেলে মেয়েরা কেমন আছে? ওদের লেখা পড়া কেমন চলছে?

- ভালো আছে। বড় মেয়েটা সামনের বছর অর্নাস ফাইনাল দিবে। দোয়া করবেন স্যার।

- অবশ্যই। তোমার তো দুই মেয়ে, এক ছেলে?

- জ্বি স্যার।

- ঠিক আছে। কাজ করো। আমি গেলাম।

মতিন সাহেব কাজে মনোনিবেশ করলো। হাতে সময় অল্প। দ্রুতো রিপোর্ট টা শেষ করতে হবে। পেট মোচড় দিয়ে জানান দিলো, দুপুরের খাবারের সময় পাড় হয়ে গেছে।তিনি তার টেবিল থেকে উঠে ক্যান্টিনের দিকে হাঁটা ধরলেন। দুপুরে তিনি অফিসের ক্যান্টিনে খাবার খান। অল্প টাকায় ভালো খাবার খাওয়া যায়। তিনি দুপুরে ভাত, ডাল আর শাক খান। এতেই তার হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মাছ খেতে মন চায় কিন্তুু অতিরিক্ত টাকা খরচ হবে দেখে তিনি খান না। অফিস শেষ করে বাসায় যেয়ে তো খাওয়া দাওয়া হবেই তাই তিনি দুপুরের খাবারে বাড়তি টাকা খরচ করেন না।

তার তিন ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করছে। তাদের লেখাপড়ার খরচ।বাড়ী ভাড়া। সংসার খরচ।তার এই অল্প আয়েই চলে। তাই বিলাসিতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। বড় মেয়েটা টিউশনি করে ছোটো ভাই বোনদের আবদার পূর্ণ করে। প্রতি মাসে মায়ের হাতে কিছু টাকা দেয়। তিনি সব কিছু জানেন। তিনি তার বড় মেয়ের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। মেয়েটা বাবার কষ্ট বুঝে। বর্তমান জমানায় এমন মেয়ের বাবা হওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। সেখানে সৃষ্টিকর্তা তাকে এমন একটা লক্ষী মেয়ে দিয়েছেন। অফিসে প্রতিদিন শুনেন এর মেয়ে এই করছে, আরেকজনের ছেলে ওই করছে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেকেই হতাশ। সেখানে তার ছেলেমেয়ে গুলো আলাদা। তাই তিনি তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে অফিসে গর্ব করে কথা বলেন। অফিসের সবাই অবাক হয়েছে - যখন তার বড় মেয়ে কোনো কোচিং না করে, একান্ত নিজের চেষ্টায় লেখাপড়া করে ভার্সিটিতে সুযোগ পেয়েছে। অনেকেই ছেলেমেয়ের পিছে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করেও সেই গর্ব করে কথা বলার সুযোগ টা পায় নি। যেমনঃদিলীপ স্যার তার মেয়েকে ৪ টা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করেছিলেন। বাসায় প্রাইভেট টিচার রেখেছিলেন। এতো কিছুর পর তার মেয়ে আজ ভার্সিটিতে সুযোগ পেয়েছে।আজ তার আনন্দের দিন। তাই তিনি অফিসের গাড়ীতে করে যারা এক সাথে বাসায় যায়, তাদের সবাইকে অফিস শেষে নাস্তা করাবেন।

সন্ধ্যা ৬ঃ০০ টা। সবাই কাজ শেষ করে অফিসের মাইক্রোবাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দিলীপ স্যার এখনও আসেন নি। তিনি এসে গাড়ীতে উঠার পর সবাই গাড়ীতে উঠবে।দিলীপ স্যার আরো দুইজন স্যারের সাথে কথা বলতে বলতে মাইক্রোবাসের সামনে এগিয়ে আসছেন।মাইক্রোবাসের ড্রাইভার, দিলীপ স্যারকে দেখে, গাড়ীতে উঠে গাড়ী স্টার্ট করলো। দিলীপ স্যার গাড়ীতে উঠলেন। অতঃপর সবাই গাড়ীতে উঠলো। স্যার গাড়ীতে উঠে মাথা ঘুরিয়ে দেখলেন  - সবাই আছে নাকী? সবাইকে দেখে তিনি ড্রাইভারকে বেলী রোডের সামনে আধ ঘণ্টার জন্য গাড়ী রাখার নির্দেশ দিলেন।গাড়ী চলতে শুরু করলো।

বেলী রোডের কাছে এসে ড্রাইভার ফাঁকা জায়গায় গাড়ী পার্ক করলো। গাড়ী থেকে দিলীপ স্যার নেমে গেলো। দিলীপ স্যারের সাথে সবাই নেমে গেলো। স্যার সুইস বার্গারে ঢুকলেন।তিনি  ১৫ টা বার্গারের অর্ডার করলেন। ড্রাইভারের জন্য একটা বার্গার পার্শেল করে দিতে বললেন। সবাই গোগ্রাসে বার্গার খাওয়া শুরু করলো। মতিন সাহেব বার্গার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে দেখে দিলীপ স্যার এগিয়ে আসলেন।

- কি ব্যাপার মতিন? বার্গার খাবে না? তুমি কি অন্য কিছু খাবে?

- না স্যার। সকাল থেকে পেট টা গড় গড় করছে। তাই খেতে মন চাচ্ছে না। যদি রাগ না করতেন, তাহলে একটা কথা বলি?

- রাগ করবো কেনো?বলে ফেলো।

- স্যার বার্গারটা পার্শেল নিয়ে যাই।

- তোমার বার্গার এটা। তুমি খেতেও পারো, আবার নিয়েও যেতে পারো। তোমার ইচ্ছা।

মতিন সাহেব দোকানের লোকটাকে বলে বার্গারটাকে  পার্শেল করে নিলো। ছেলেমেয়ে গুলো বার্গার টা দেখলে খুশী হবে। এতো মজাদার বার্গার খেয়ে ওরা মজা পাবে। ওদের আনন্দই তো আমার আনন্দ। তাছাড়া এই দোকানের বার্গারটা নাকী অনেক মজার। সবাই প্রশংসা করে।সবার খাওয়া শেষ। সবাই দিলীপ স্যারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। সবাই বাসায় ফেরার জন্য গাড়ীর দিকে রওয়ানা দিলো।একটু পরে ঢাকা শহরের রাস্তায় বিখ্যাত জ্যাম লেগে যাবে। মতিন সাহেব বার্গারটা পার্শেল করে নিয়ে নিলেন। সবাই গাড়ীতে উঠার পর ড্রাইভার গাড়ী আবার স্টার্ট দিলো।এখন সব স্যারদেরকে যার যার নির্দিষ্ট জায়গায় নামিয়ে দিতে হবে। সবার শেষে বাড়ী হলো - মতিন সাহেবের।বাড়ীর কাছাকাছি আসতেই একে একে সবাই নেমে গেলো। গাড়ীতে মতিন সাহেব একা একা বসে আছেন।

রঙিন শহরের ল্যাম্পপোষ্টের রঙিন আলোয় মাইক্রোবাস চলছে। সেই গাড়ীতে একজন বাবা বসে আছেন। তার হাতে একটা বার্গারের প্যাকেট।

অবশেষে মাইক্রোবাস এসে থামলো। মতিন সাহেব গাড়ী থেকে নেমে গলির ভিতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসার দিকে যাচ্ছেন। তার হাতে মজার একটি বার্গারের প্যাকেট....
-
লেখকঃ তানভীর।


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 Comments: