গল্প নং: (০৩)
নামঃ “প্রতিদান”
-
গেট দিয়ে বাসায় ঢুকতে যাচ্ছিলাম। থপ করে কিছু একটা পড়ল আমার পাশে। পাশে তাকিয়ে দেখি একটা ওয়ালেট পড়ে আছে। ওপরে তাকালাম। পাঁচ তলার জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে ভারি ফ্রেমের চশমা পড়া একজোড়া চোখ। মৃদু হেসে ওয়ালেট টা তুলে নিয়ে সিঁড়ি ভাঙ্গতে লাগলাম। পা দুটো ক্লান্তি জানান দিচ্ছে। লিফট নেই এ বাড়িটাতে। পাঁচ তলায় পৌঁছুতে শরীর হাঁপিয়ে উঠল। এ সময় সিঁড়ি বওয়া বেশি ভাল নয়। ডাক্তার নিষেধ করে দিয়েছে।
কলিং চাপতে হল না। দরজা খুলে গেল। সেই চোখজোড়া বেরিয়ে এল। হাত বাড়াল আমার হাতে ধরা ওয়ালেটের দিকে। একটা বাচ্চা এসে দাঁড়াল দরজা ঘেষে। আমি সেটা তার হাতে তুলে দিতেই দেরী না করে মুখের ওপরে দরজাটা লাগিয়ে দিল ভদ্রলোক। বেশ হকচকিয়ে গেলাম। বাচ্চাটার জন্য মন কেমন করে উঠল। ইস! দেখতেও পারলাম না ঠিকমত। আর দেরী না করে নিচের দিকে নামতে আরম্ভ করলাম। বিছানা টানছে আমাকে।
ছাদে টব গুলোর না জানি কি অবস্থা। যেতে চাইলে অর্ক বাধা দেয়। আমার এত সাধের ফুল গাছ!!
আজ অর্ক অফিসে চলে গেলে ছাদে গেলাম। বেশ কষ্ট হল অবশ্য। নাহ, গাছগুলো ভালই আছে। ভাড়াটে মহিলারা হয়ত যত্ন নেয় রোজ। নিচে নামছিলাম। পাঁচতলার ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খোলা। ওয়াশরুমের ভেতর থেকে থপথপ শব্দ আসছে। কাউকেই চোখে পড়ছে না। কৌতূহল হল তবে ভেতরে যেতে সঙ্কোচ লাগছে। নেমে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালাম। বাচ্চাটা কি ওয়াশরুমে একা? ফ্ল্যাটের ভেতরে পা রাখলাম। ওয়াশরুমের ভেতরে উঁকি দিতেই কেমন চমকে উঠলাম। পানি ভর্তি বালতির সামনে বাচ্চাটা পানি নিয়ে খেলছে। হঠাৎ বালতিতে পড়ে গেলে চিৎকার করার সুযোগও পাবে না বাচ্চাটা। এভাবেই গত বছর একটা বাচ্চা মারা গেছে।
চট করে সরিয়ে আনলাম বাচ্চাটাকে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে চোখে পড়ল না কাউকেই। কিচেন থেকে খুঁট-খাট শব্দ শুনতে পেয়ে সেদিকে গেলাম। দেখি ডিম ভাজছে লোকটা। আমাকে দেখতে পেয়ে কেমন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম-
আরে, আজব মানুষ আপনি! বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিয়ে রান্না করছেন, বাচ্চাটা ওদিকে পানিতে ডুবে মরলে?? কি করছিল বাথরুমে জানেন….
আমার হাত থেকে বাচ্চাটা নিয়ে সোজা বেডরুমে চলে গেল লোকটা। একটা কথাও বলল না। দাঁড়াব না চলে যাব বুঝতে পারলাম না। খানিক দাঁড়িয়ে থেকে চলে এলাম নিচে।
অসভ্য একটা লোক! বিড়বিড় করলাম একা একা। এ সময় উত্তেজনা ভাল কথা নয়। বেশ রাগ লাগছে। তবে বাচ্চাটা নিরাপদে আছে এই যা স্বস্তি।
….… তীব্র ব্যথা আর আতঙ্ক নিয়ে মাঝরাতে চোখ মেললাম আমি। অর্কের দিকে তাকালাম। বেশ গভীর ভাবে ঘুমোচ্ছে। আজও হ্যা আজও ডাকতে হবে ওকে। ওর ঘুম ভাঙ্গাতে মন চাইছে না মোটেও। আহ! না ডাকলে যদি হত!!
অজ্ঞান ছিলাম কয়েক ঘন্টা। সেন্স ফিরতেই মাথার ওপরে স্থির একটা সিলিং ফ্যান চোখে পড়ল। কম্বলে মোড়ানো আমি। তবু বেশ ঠান্ডা লাগছে। চোখ ফেরাতেই ব্লাড ব্যাগের দিকে নজর পড়ল। আর পাশেই অর্ক দাঁড়িয়ে। তাকিয়ে আছে আমারই দিকে, উদগ্রীব হয়ে।
হাসার চেষ্টা করলা আমি। অনুভব করলাম ঠোঁটদুটো শুকনো। হল না অর্ক… এবারও হল না। মাফ কর আমাকে। ফিসফিস করে বললাম আমি।
ঝুঁকে এসে অর্ক আমার কপালে হাত রাখল। চোখ থেকে পানি ঝরছে আমার অবিরাম।
তুমি মাফ কর আমাকে। অস্ফূট স্বরে বলল অর্ক। আমি ভেবেছিলাম…. এবার হয়ত…. তবে আর কষ্ট করতে হবে না তোমাকে। আমাদের শূণ্যতা আর থাকবে না তুমি দেখো। একটা উপহার এনেছি তোমার জন্য।
তাকিয়ে রইলাম আমি। অর্ক বাইরে গেল। ফিরে এল একটু পরেই। তবে একা নয়, কোলে একটা বাচ্চা। তাকিয়েই রইলাম আমি। এই বাচ্চাটা…. এই বাচ্চাটা তো….
আবরার সাহেব একা বাচ্চাটাকে মানুষ করতে পারছিলেন না। অর্ক বলল। ওনার স্ত্রী মারা গেছে জান তো? আমাদের চারটা বাচ্চা মিসক্যারেজের কথা শুনে তিনি নিজে থেকেই বাচ্চাটা দিতে চাইলেন। তোমার রক্তের গ্রুপের সাথে ওনার রক্তের গ্রুপ মিলে গেছে। উনিই তো তোমাকে রক্ত দিলেন এক ব্যাগ।
অনেকগুলো অনুভূতি একসাথে কাজ করছে আমার ভেতরে। নির্বাক চাহনীতে সেই অনুভূতি গুলো প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
কষ্ট হয় ওনার জন্য। এত ভালো একজন মানুষ অথচ দেখ তিনি কিনা বাকপ্রতিবন্ধী। কথা বলতে পারে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলল অর্ক।
-
লেখাঃ জাকিয়া সিদ্দিকী।



0 Comments: