গল্প নং: (০৮)
নামঃ একটা রিয়ার গল্প।
(গল্পটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত হয়েছে)
-
হাসপাতালের বেড এ শুয়ে আছে রিয়া, চোখের কোনে অশ্রু,চিৎকার করে কাদতে চেয়েও কাদতে পারছে না, কিন্তু চোখের জল মনের সাথে যুদ্ধ করে পেরে উঠছে না
.
ফোনটা হাতে নিল। বাবাকে ফোন করবে ভেবেও করেনি। বাবা অনেক ব্যাস্ত মানুষ। রিয়ার শারীরিক অবস্থা অনেক খারাপ হওয়াতে হাসপাতালে এডমিট করিয়ে বাসায় চলে যায় বাবা।
.
মায়ের হাতের রান্না খেতে মন চাচ্ছে তার। কিন্তু কিভাবে খাবে?? মাও যে ব্যাস্ত মানুষ। একটা স্কুলের হেড টিচার উনি। স্কুল রেখে আসতে পারবেন না উনি।মেয়ে অসুস্থ তাই যথেষ্ট টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন মেয়েকে চিকিৎসা করানোর জন্য।
.
এবার রিয়ার শারীরিক আর মানসিক অবস্থা নিয়ে বলি
.
গ্রামের সহজ সরল মেয়ে রিয়া। বাবা মা দুই জন ই টিচার।পড়ালেখার হাতেখড়ি মায়ের হাত ধরেই। কোন কিছুতেই কমতি চিল না। রিয়াও অত্যন্ত মেধাবী ছিল। ক্লাস ৫,৮ এ স্কলারশিপ, এস এস সি তে ওদের গ্রামের একমাত্র জিপিএ ৫ শুধু ওর ই।। তখনই ব্যাঘাত টা শুরু হয়,,। একদিন পিরিয়ড এর সময় প্রচন্ড ব্যাথা শুরু হয় আর সাথে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ত আছেই। কিছুতেই থামছে না। রাতেই হাসপাতালে নেয়া হয়।ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বললেন ওভারি তে ছোট্ট টিউমার আছে,, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে বললেন যদি টিউমার বড় হয়ে যায় অথবা অন্য কোন যায়গায় ছড়িয়ে যায় তাহলে অপারেশন করে ফেলতে হবে।
.
বাবা মা ব্যাপার টা গোপন রাখলেন। যদি পাড়া প্রতিবেশী কেউ জেনে ফেলে তাহলে মুখ দেখাতে পারবেন না উনারা, আর পাশের বাসার কোন মেয়ের ও জানি এই টিউমার হইছিল। হোমিওপ্যাথি খেয়ে ভাল হয়ে গেসে। শুরু হয়ে গেল হোমিও চিকিৎসা। রিয়াকে বারন করা হইছে তার এই সমস্যার কথা যাতে কেউ ভুলেও না জানে।
.
এর মধ্যে রিয়ার এইচ এস সি এক্সাম গেল। আবার ও জিপিএ ৫।অনেক ইচ্ছা ছিল ডাক্তারি পড়ার। সেবার প্রশ্ন আউট হইছিল। গ্রামের ব্যাকডেটেড মেয়ে রিয়ার কোন লিংক ছিল না। অনেক পরিশ্রম, শত রাত জাগা, লালিত স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। মানতেই পারছিল না কেউ। প্রাইভেট মেডিকেলে পড়তে চাইল।কেউ ই পড়তে দিল না। মেয়ে মানুষের পিছনে নাকি এত খরচ করে লাভ নেই।
.
সে যাই হোক,২ বছর আগের টিউমার টা বড় হতে লাগল, ডাক্তার জানাল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশন করতে হবে। নইলে বিপদ হতে পারে। কিন্তু ব্যাস্ত বাবা মার সময় কই??যদি কখনো ৭ দিনের ছুটি পায় তাহলে অপারেশন করাবে যাতে মেয়ের পাশে থাকতে পারে। কিন্তু টিউমার ত ছুটির অপেক্ষায় নেই। লাস্ট যেদিন রিয়া ডাক্তারের কাছে গেল বলে দিসে অপারেশন ইজ দ্যা অনলি সলিউশান।
.
ও বাবা মা কে জানায় নি কারন জানালেও লাভ নেই। কানে নিবেন না। রাতে বারান্দায় বসে কাদে, মানসিক ভাবে আরও বেশি ভেনংগে পড়ে।আজ মেয়ে বলে এত তিরস্কার, এত অবমুল্যায়ন ওর।বিয়ের আগে অপারেশন হলে নাকি মেয়েকে ভাল যায়গায় বিয়ে দিতে পারবে না অথবা প্রচুর টাকা বর কে দিতে হবে।
.
পরশু রাতে প্রচুর ব্যাথা আর রক্তক্ষরণ হয় রিয়ার। বাবা ওকে ঢাকার একটা ভাল হাসপাতালে এডমিট করিয়ে বাসায় চলে যায়। একজন আন্টি আছে শুধু।উনাকেও বুঝানো হইছে আত্নীয় সজন কেউ যাতে না জানে।জেনে গেলে কানকাটা যাবে।লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবেন না। বেচারি রিয়া নিজের রক্ত নিজেই যোগাড় করতেসে। এই বন্ধু ওই বন্ধু কে ধরে,
কোথায় আত্নীয় সজন এর এগুলা করার কথা, মেন্টাল সাপোর্ট দেয়ার কথা অথচ আজ কেউ নাই ওর পাশে। এসব ভাবে আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদে, আজ মেয়ে বলে পদে পদে এত্ত কিছু সহ্য করতে হয়।।।
.
একজন শিক্ষিত বাবা মা হয়ে কি করে এমন মনোভাব থাকে??
এই ২০১৮ তে এসেও মেয়েরা এত্ত পিছিয়ে??
এত্তটাই বোঝা মেয়েরা??
উনাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রইল
.
আর এমন হবেই না কেন
যেই সমাজ মেয়েদের পিরিয়ড এর কথা শুনলে পিছনে হেসে উঠে
যেই সমাজে মেয়েরা দোকানে প্যাড কিনতে যেতে ভয় পায়, হাজার বার ভাবতে হয়
পিরিয়ডের সময় রোজা রাখে কিনা এই প্রশ্নের না উত্তর শুনে সেই সমাজ মজা নেয়
.
সে সমাজে ত এমনই হবে।।
.
এটা শুধু একটা রিয়ার গল্প না, হাজারো রিয়ার গল্প।।
সমাজের বোধোদয় হউক ☺
।
.
(পর্বঃ ০২)
-
রিয়ার কথা মনে আছে??
ঐযে হাসপাতালের বেডে ব্যাথায় কাতরাচ্ছিল মেয়েটা
ওভারিয়ান টিউমার নিয়ে।
এলাকার মানুষজন জেনে গেলে আর বিয়ে হবে না ভেবে বাবা মাও কাউকে বলে নি। একাই এক আন্টির কাছে পাঠিয়েছে। উনিই যতক্ষন পারছেন রিয়ার পাশে থাকছেন।।
.
১২.৯.১৮
এখনো হাসপাতালে রিয়া। ব্যাথা আর প্রচুর রক্তক্ষরণ। ররক্তক্ষরণ এখনও বন্ধ হচ্ছে না। ডাক্তার রাউন্ডে এসে বলে গেলেন যত দ্রুত সম্ভব অপারেশন করিয়ে ফেলতে।
রিয়া কি করবে বুঝতে পারছে না। বাবা মা কে বলবে??বাবা মা কে বলে লাভ হবে বলে মনে হয় না। উনারা স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে আসতে পারবে না। আসলে পারবে না যে তা না। ছুটি ত নিতেই পারবে। কিন্তু ২ জন একবারে ছুটি নিলে বাড়ির সবাই সন্দেহ করবে। ছুটি নিয়ে কই গেল?? আর রিয়া কই? যে মেয়ে প্রতি সপ্তাহে বাসায় আসে সে অনেকদিন ধরেই আসছে না। যদি জানাজানি হয়ে যায় তাহলে ত মান সম্মান শেষ বাবা মার। মেয়ের জন্য মুখ দেখাতে পারবে না। বিয়েও দিতে পারবে না। তাই ফোন হাতে নিয়েও আর ফোন দেয়া হয়নি বাবা মা কে। একটু আগে আন্টি এসেছিল দেখতে। নুডুলস নিয়ে এসেছে। একমাত্র নুডুলস এর উপরেই বেচে আছে সে। অন্য কোন খাবার গলা দিয়ে নামে না। খেলেই বমি আসে।
.
রাত ১০ টা
ব্যাথা টা ক্রমশ বাড়ছে। কাদতে চেয়েও কাদতে পারছে না সে। অন্য রোগীদের সমস্যা হতে পারে ভেবে।কিছুক্ষন সহ্য করল। ব্যাথা কমে যাবে, ব্যাথা কমে যাবে বলে বলে মনকে বুঝানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু না। ব্যাথা কমে নি। বাড়ছেই। ঘন্টাখানেক পর শুরু হল রক্তক্ষরণ। আন্টিকে ফোন দিয়ে আসতে বলবে তাও পারছে না। ডাক্তার আসলেন। ইম্মেডিয়েট রক্ত লাগবে বলে গেলেন। রিয়া এতদিন নিজের রক্ত একে ওকে ফোন দিয়ে ঝোগাড় করেছে। পরিচিত আর কেউ নেই। কি করবে ভাবতে পারছে না। তখন এক নার্স নিজে থেকেই রক্ত দিতে চাইলেন। রক্ত দিলেন। ডাক্তার এসে ব্যাথার ঔষধ দিয়ে গেলেন। আস্তে আস্তে ব্যাথা কমল। সে রাত এভাবেই কেটে গেল।
.
১৪.৯.১৮
রিয়ার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ আজ। সম্ভব হলে আজকেই অপারেশন করতে বলে গেলেন ডাক্তার। রিয়া বাবা মা কে ফোন দিল। উনারা আজ রাতেই আসবে। রিয়াকে বললেন অপারেশন এর কথা যাতে কাউকে না বলে। অনেক আগেই অবশ্য তার ওভারিয়ান টিউমার আছে এই কথা কাউকে বলতে নিষেধ করেছিল। রিয়া কাউকে বলে নি।
মাঝখানে রিয়ার জীবনেও প্রথমবারের মত প্রেম এসেছিল। একটা ছেলে তাকে অনেক পছন্দ করত। রিয়া অনেকবার মানা করার পরেও ছেলেটা পিছু ছাড়ে নি। সে প্রতিনিয়ত খোঁজ খবর নিত। অনেক টেক কেয়ার করত। অবশেষে রিয়া রাজি হয়। ৬ মাসের মত তাদের সম্পর্ক টিকেছিল। আস্তে আস্তে যখন রিয়া ছেলেটার প্রতি উইক হতে লাগল তখন
.
রিয়াঃ শোন আমি জানি তুমি আমাকে অনেক ভালবাস। কিন্তু আমার একটা সমস্যা আছে যা তুমাকে বলা হয় নি।
ঃকি সমস্যা বল
ঃআমার ওভারিয়ান টিউমার আছে। ডাক্তার বলেছে অপারেশন না করালে ক্যান্সার ও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমার বাবা মা এখন অপারেশন করাতে রাজি না। জানিনা এটা জানার পর তুমি থাকবে কিনা কিন্তু আমি তোমার কাছে লুকাতে চাইনা। তাই বললাম
ঃআরে এটা হয়েছে ত কি হয়েছে। ভাল যখন বেসেছি এসব কোন ব্যাপার নয়।
ঃসত্যি ত।
ঃহুম। হাতটা ছেড়ে দেবার জন্য ধরি নি। সারাজীবন এই হাত ধরেই থাকতে চাই। যত যাই হোক না কেন আমি তোমার পাশে ছায়ার মত থাকব।
.
সম্পর্ক টা আর টিকে নি। ছেলেটা আস্তে আস্তে ইগ্নোর করা শুরু করে। এবং একসময় রিয়ার বিশ্বাস ভেংগে ছেলেটা রিয়াকে একা করেই চলে যায়।
.
একদিকে মেয়ে বলে আর জাতীয় ভার্সিটি তে পড়ে বলে অপমান সহ্য করতে হয় তার উপর ভালবাসার মানুষ একা করে চলে যাওয়ায় মানসিকভাবে অনেকটাই ভেংগে পড়ে সে। কত রাত তার নির্ঘুম কেটেছে আর কতশত বার পুরনো এস এম এস পড়ে বালিশ ভিজিয়েছে তা শুধু রিয়াই জানে।
.
সে হাসপাতালের বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে এটাই ভাবে সে পরিবারের কাছে কতটা মূল্যহীন, কতটা ফেলে দেওয়া পাত্রের মত।
.
রাতে বাবা মা এল। ডাক্তারের সাথে কথা বললেন অপারেশন ছাড়া বিকল্প কোন রাস্তা আছে কিনা!! ডাক্তার বুঝালেন এটাই এখন রিয়াকে বাচানোর একমাত্র রাস্তা। বাবা মা পরদিন অপারেশন করাতে রাজি হলেন।
.
আর হ্যা, আর একজন ছেলে আছে রাজু, যে রিয়ার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। এই চরম পরিস্তিতিতে যে তার পাশে দাড়িয়েছে। মেন্টালি সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে। রিয়া তার কষ্টের কথা শুধু তার সাথেই শেয়ার করতে পারে।
.
১৫.৯.১৮
সকাল ১০ টা। রিয়াকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাজুর সাথে কাল রাতে রিয়া বলেছিল রক্ত মেনেজ করে দিতে। রাজু তার এক বন্ধুকে নিয়ে রক্ত দিতে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু রিয়ার বাবা মা এটা নিয়েও কথা শুনাবে ভেবে রাজি হয়নি সে। তার বাবার এক মামাতো ভাই এসেছেন রক্ত দিতে।
.
অপারেশন হল। টিউমার টা কেটে বের করা হল। রিয়া এখন পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারে। ডাক্তার আশ্বাস দিয়েছেন অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে সুস্থ্য হয়ে যাবে।
দুদিন পরেই তাকে আন্টির বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাবা মা তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্টির বাসায় রিয়াকে দিয়ে উনারা আবার চলে গেলেন গ্রামের বাড়িতে।
.
১৭.৯.১৮
রাত ১ টা। রিয়া ঘুমাচ্ছিল। ব্যাথা শুরু হয়ে যাওয়ায় ঘুম ভেংগে যায়। ব্যাথা বাড়তে থাকে। সাথে রক্তক্ষরণ। মাসিক এর ডেট শেষ। তবুও রক্তক্ষরণ কমছে না। মাসিকের চাইতেও বেশি রক্ত যাচ্ছে। আন্টিকে ডাকবে সাহস করতে পারছে না। এই কিছুদিনে সে বুঝতে পারে উনিও তার উপর বিরক্ত। বিরক্ত হবেই না কেন? মা বাবা এভাবে ফেলে চলে যেতে পারে আর উনি একা আর কত ঝামেলা সহ্য করবেন?!
এরই মধ্যে সন্ধ্যায় বাবা ফোন দিয়েছিল। বলল প্রাইমারী শিক্ষক নিয়োগ এর জন্য যাতে প্রিপারেশন নেয়। একে ত অপারেশন করাতে হইছে তার উপর যদি একটা চাকরি না পায় তাহলে ভাল যায়গায় বিয়ে দিতে পারবে না। কি অবস্থায় তার বাবার কি ধরনের চিন্তাধারা। ভাবা যায়??
গত দুই দিনে ব্যাথা একটু কমলেও আজ আর সহ্য করতে পারছে না। তার উপর বাবার এমন কথা।
ব্যাথায় কাতরাচ্ছে।। এভাবে ১ মাস যাবত কষ্ট তার আর ভাল লাগছিল না। প্রেমিকের চলে যাওয়ার পর সে কিছুদিন ঘুমের ট্যাবলেট খেত। এখনও আছে কয়েকটা। সন্ধ্যায় বাবার সাথে কথা বলার পর তার মনেই হয়েছিল এই পৃথিবী তার জন্য নয়। ধুকে ধুকে মরার চাইতে একবারে মরে যাওয়া ভাল।বিছানার পাশেই তার সকল ঔষধ রাখা। বিয়ে হবে না,চাকরি পেতে হবে,সাথে অসহ্য ব্যাথা।।। না মরেই যাই। নয়ত ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমিয়ে যাই।ব্যাথা টের পাব না। এসব ভাবতে ভাবতে ৩ টা ট্যাবলেট খেয়ে ফেলে সে। কিন্তু তারপরও ঘুমও আসছে না ব্যাথাও কমছে না।
.
ফোনের ডাটা অন করে রাজুকে টেক্সট করল। রাজু অনেক বুঝাল। আজকের রাতটা সহ্য করতে বলল। কাল আবার ডাক্তার এর কাছে যেয়ে পরামর্শ নিতে বলল।আর ব্যাথার ঔষধ খেয়ে আল্লাহ আল্লাহ করতে বলল।
.
একসময় রক্তক্ষরণ অল্প কমল। ব্যাথার ঔষধ খাওয়ায় ব্যাথাও কিছুটা কমল।
.
ভোর ৫ঃ৩০
আন্টিইইই
আন্টি তাড়াহুড়া করে রিয়ার রুমে আসল। রিয়ার প্রচন্ড ব্লিডিং হচ্ছে। জামা, বিছানা রক্তে লাল হয়ে গেসে। আংকেল তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স এর জন্য ফোন দিলেন।
.
সকাল ৭ টাঃ
ডাক্তারঃ ভাগ্যিস আপনারা নিয়ে আসছিলেন এত সকাল সকাল। যদি সকাল হওয়ায় জন্য অপেক্ষা করতেন তাহলে হয়ত আর ওকে বাচানো যেত না। রিয়ার কন্ডিশন খারাপ। ওকে হাসপাতালেই রাখেন। আমাদের কাছেই থাকুক। কখন কি হয়ে যায় কে জানে।
.
আজ ২ ব্যাগ রক্ত লাগছে। রিয়া একা একা আর ম্যানেজ করতে পারছে না। রাজু যে কাউকে নিয়ে এসে দিবে সে রাস্তাও নেই। রাজু আসলেই আন্টি জিজ্ঞাসা করবেন এ কে?কি সম্পর্ক?? বাবার কাছে বলে দিবে।
.
১১২ নাম্বার কেবিন। বিছানার একপাশে জড়োসড়ো রিয়া। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আর কখনো সুযৌদয় দেখতে পাবে কিনা ভাবছে।
আমার জীবনটাই এমন কেন??আমার সাথেই কেন এমন হচ্ছে?? মেয়ে হয়ে জন্মাইছি এটাই আমার পাপ? আমার ওভারিয়ান টিউমার ছিল এটাই আমার পাপ? আমি কি আল্লাহর কাছে চাইছি নাকি যে আমাকে টিউমার দাও??
ভাবতে ভাবতে চোখের কোনে জল এসে গেল নিজের অজান্তেই। চোখ মুছতে মুছতে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল সে।।
।
.
(শেষ পর্ব)
১৯.৯.১৮
.
সকাল ১০ টা। রিয়া এখন মোটামুটি সুস্থ্য। ব্যাথাও নেই আর রক্তক্ষরণ ও নেই। ডাক্তার বলে দিয়েছে আর কোন ভয় নেই। রিয়া এখন বাসায় যেতে পারে। ১ মাস বিশ্রাম দিয়েছে তাকে। কোন ভারী কাজ করা যাবে না, মানসিক দুশ্চিন্তা করা যাবে না। আন্টি রিয়াকে বাসায় নিয়ে যায়। আর রিয়া ডাক্তারের নাম্বার নিয়ে আসে যাতে প্রয়োজনে ফোন দিতে পারে।
.
আন্টির বাসায় গিয়ে খাওয়া দাওয়া করল। দুপুরে বাবা আসছে রিয়াকে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাবে। রিয়ার ও ইট পাথরের এই যান্ত্রিক শহরে মন বসছিল না। বসার কথাও না।গ্রামের মানুষ শহরে আসলে অনেকটা কনজেস্টেড হয়ে যায়।যতক্ষন গ্রামে যেতে না পারে ততক্ষন ই দম বন্ধ হয়ে থাকে। তাই রিয়া তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিল। অনেকদিন পর গ্রামে যাবে। বুক ভরে নিশ্বাস নিবে।আর এই কয়দিনে যে পরিমাণ ধকল গেসে শরীর আর মনের উপর দিয়ে। রিয়া আর ভাবতে চাচ্ছে না সে কথা।
.
ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যেতে ৬ ঘন্টা সময় লাগল। রিয়া অবশ্য চেয়েছিল প্রাইভেট কারে যাতে তাহলে বাসের ঝাকুনি কম লাগত। কোন এক কারনে তা আর হয়ে ওঠে নি। পুরোটা রাস্তা বাসে আসায় বাসের ঝাকুনি তে বাড়ি যাবার পরই রিয়ার তলপেটে ব্যাথা শুরু হল। ফ্যামিলির কেউ একজন বলল *এসব ঢং বন্ধ কর*। রিয়া অবশ্য কানে নেয় নি। ও এতদিনে বুঝে গেসে ওর কিভাবে চলা উচিত। ডাক্তারকে ফোন করে ব্যাথার ওষুধ খেল। আস্তে আস্তে ব্যাথা কমল।সেদিন আর কোন ঝামেলা হয়নি।
.
২২.৯.১৮
গত দুই দিনে রিয়া মোটামুটি সুস্থ্য হয়ে গেসে। হাটাচলা করতে পারছে। আর মায়ের মেয়ে মায়ের কাছে আসায় যত্ন আত্তিও পাচ্ছে ভাল। রিয়াকে জাস্ট বলেছে, মা তুমি যেন এই অপারেশন এর কথা কাউকে না বল। তুমি আরেকটু সুস্থ্য হলে তোমার হোস্টেলে দিয়ে আসব। আমি প্রতিদিন সময় করে তোমার কাছে যাব।আর ডাক্তার যেহেতু বলছে হয়ত আর সমস্যা হবে না।
.
রিয়ার বাবা ততক্ষণে মেয়ের জন্য পাত্র দেখা শুরু করে দিয়েছেন। রিয়ার মতামত চাইলে মুখের উপর মানা করে দিয়েছে সে। ভাল একটা চাকরি পাওয়ার আগে সে বিয়ে করবে না। আগামীকাল ছেলে দেখতে আসবে।রিয়াকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বলে দিলেন উনি।
.
২৩.৯.১৮
বাড়িতে উৎসবমুখর পরিবেশ। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। ২ ভাই ১ বোন। সবাই ভাল জব করে। শিক্ষিত পরিবার। রিয়ার বাবার অনেক পছন্দ হয়েছে ছেলেকে।ছেলের পরিবারের ও রিয়াকে পছন্দ হয়েছে। কথা পাকাপাকি করার আগে মুরব্বিরা বললেন ছেলে মেয়েকে আলাদা কথা বলতে দেয়া হোক।
.
ছেলেই প্রথম কথা শুরু করল
ঃতুমি মাশাল্লাহ অনেক সুন্দর।আমার ও আমার পরিবারের তোমাকে অনেক পছন্দ হয়েছে। তোমার কোন আপত্তি আছে রিয়া??
.
ঃহুম। আমি এই বিয়ে করতে চাইনা। আমি পড়াশোনা শেষ না করে বিয়ে করতে পারব না।
.
ঃসমস্যা নাই।বিয়ের পর পড়বা।
ঃসমস্যা আছে। সংসার আর বিয়ে একসাথে হয়না। আমি এখন বিয়ে করতে পারব না। আর শুনোন আপনার সাথে কথা আছে। ফোন নাম্বার দিয়ে যান।
.
ছেলে নাম্বার দিল। দুই পরিবার মোটামুটি পাকা কথাবার্তা সেড়ে নিচ্ছে। সন্ধ্যায় সবাই চলে গেল।
রিয়াকে আবার জিজ্ঞাসা করা হল সে রাজি কিনা??
ঃআমার ওভারিয়ান টিউমার এর অপারেশন হইছে বলছ উনাদের??
ঃনা মা। কেন?
ঃবল নাই কেন?
ঃএত্ত ভাল ছেলে, ইঞ্জিনিয়ার। এলাকার সবার সাথে বুক ফুলিয়ে বলতে পারব আমার মেয়ের জামাই ইঞ্জিনিয়ার।
ঃআমি এতশত বুঝিনা। আমি ফোন করে বলে দিব সব কথা।
আমি এই বিয়ে করব না। হতে দিব না।
.
কিছুক্ষন বাবা মা এর সাথে কথা কাটাকাটি হল।উনাদের সেই কমন খোচা গুলা এপ্লাই করতে লাগল,, গাধী তুমি,পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পার না ন্যাশনাল এ পড়,কলিগরা যখন আস্ক করে মেয়ে কই পড়ে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে ফেলি,তার উপর টিউমার বাধাইছিলা একটা।
.
রিয়া যতক্ষন পারে জবাব দেয়ার চেষ্টা করল।যখন আর পেরে উঠতে পারেনি কাদতে কাদতে পুকুর পাড়ে চলে গেল।
রাজুকে ফোন দিয়ে বিস্তারিত বলল। রাজু প্রথম প্রথম বুঝাচ্ছিল হয়ত এই বিয়েটা করে ফেললেই সবাই খুশি হবে। রিয়ার কষ্টের দিন শেষ হবে।কিন্তু রাজু যখন শুনল ছেলেপক্ষ অপারেশন এর ব্যাপারে জানেনা তখন রিয়াকে বলল ফোন দিয়ে জানিয়ে দিতে। তারপরও যদি ছেলে বিয়ে করতে চায় তাহলে রিয়া যাতে বাবা মায়ের কথা ভেবে রাজি হয়ে যায়।
.
রিয়া ছেলেকে ফোন দিয়ে সবকিছু জানিয়ে দিল।ছেলের পরিবার এসব শুনে ভয়ংকর ক্ষেপে গেল। শিক্ষিত মানুষ হয়ে এটা লুকানোর কি আছে? আমরা ত অবশ্যই মেনে নিতাম। রিয়ার বাবাকে ফোন দিয়ে অনেক কথা শুনাল।
তারপর যা হবার তাই হল। সবাই মিলে রিয়াকে কথা শুনাল। রিয়া শুনেও না শুনার ভান করে রইল। বিয়ে আটকানো টাই তার কাছে ফ্যাক্ট।
.
২৬.৯.১৮
বাসায় অনেক খাবার দাবারের আয়োজন করা হচ্ছে। রিয়ার বুঝতে বাকি রইল না কি হতে চলছে। নিশ্চয়ই কোন না কোন ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে। সবাই যখন কাজে ব্যাস্ত এই সুযোগে রিয়া বাড়ি থেকে পালাল। তার এক বান্ধবীর বাসায় চলে গেল। পৌছে বাসায় ফোন দিয়ে বলল, ছেলেপক্ষকে বলে দিও মেয়ে পালাইছে। বিয়ে করবে না।আমি আমার এক বান্ধবীর বাসায় আসছি। আজ বাড়ি আসব না। ফোন দিলেও লাভ নাই। আমাকে পাবা না। বিয়ে আমি করব না। কথা শেষ করে রিয়া ফোনের সুইচ অফ করে দিল।
.
এ বিয়েটাও হলনা। বাবা মা ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন কি করা যায় এই মেয়েকে নিয়ে।
পরদিন মা রিয়াকে বান্ধবীর বাসা থেকে আনতে গেলেও সে আসল না।
তার একটাই কথা, আমাকে ভাল জব পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিয়ে দিতে পারবা না।আজ রাতে বাবা আর তুমি ভাব। আমি কাল বাড়ি আসব।
রিয়ার আম্মু বাসায় চলে গেল।
.
২৯.৯.১৮
রিয়ার বাবা মা বিয়ের চিন্তা আপাতত বাদ দিলেন। রিয়ার আব্বু আম্মু কেন এমন করছেন নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। রিয়ার সাথে কথা বলে রাজু সরাসরি কথা বলতে চাইল রিয়ার আব্বু আম্মুর সাথে। এর আগে রাজু একবার তাদের বাসায় গেসিল ইদে দাওয়াত খেতে। রাজুকে উনারা ভাল হিসেবেই চিনে।
তাই এই ভরসায় রাজু বিকাল বিকাল রিয়াদের এলাকায় পৌছাল। বাজারে এক কফিশপে বসে রাজু রিয়াকে আসতে বলল। ১০ মিনিট পরই রিয়া আসল।এর আগে একবার ই তাদের দেখা হয়েছিল।কিন্তু এই রিয়া আর আগের রিয়া নেই। চেহারায় ক্লান্তি আর বিষন্নতার ছাপ।মনে হচ্ছে কত রাত ঘুমায় না সে। চোখগুলা ভিতরের দিকে ঢুকে গেসে।চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেসে।
কিছুক্ষন গল্প করে রিয়া রাজুকে নিয়ে বাসায় আসল। আংকেল আন্টিকে সালাম দিয়ে সোফায় বসল। তারপর যা কথা হল নিজের মত বলে যাই,,,,,
.
রিয়া অনেক মেধাবী ছিল। বাবা মা চেয়েছিল মেয়ে ডাক্তার হবে। সবসময় ভাল রেজাল্ট করলেও মেডিকেলে চান্স পায়নি। উনাদের এক কলিগের মেয়ে ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। প্রতিদিন স্কুলে গেলেই উঠতে বসতে রিয়ার আম্মু কে ছোট করে কথা শুনায়। তখন বাবা মা রিয়াকে প্রাইভেট মেডিকেলে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল। রিয়াও অনেক খুশি স্বপ্নপুরন হতে যাচ্ছে। তখন ই ফুফু আসল বাপ দাদার দাবি দাওয়া নিয়ে। জায়গা জমি যা পাবে রিয়ার আব্বুদের কাছে তা উনি চান না। উনার ছেলেকে মেডিকেলে পড়াতে চান। সব খরচ যাতে রিয়ার বাবা মা দেয়। উনারা বলেছিলেন রিয়াকে মেডিকেলে পড়াবে। এই কথা বলার পর সবাই রিয়ার বাবাকে বুঝাতে লাগল মেয়ে মানুষকে এত খরচ করে পড়ানোর প্রয়োজন নেই। আয় রোজকার করে জামাই কেই খাওয়াবে। তার চাইতে এই টাকা দিয়ে ফুফুর ছেলেকে পড়ালে যদি উনি বাকিসব সম্পত্তি থেকে ভাগ না চান তাহলে জায়গা জমি ভাগ বন্টনের ঝামেলা থাকবে না। পারিবারিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আর সবার মন রক্ষা করতে উনি মেয়ের জন্য জমানো টাকা দিয়ে রিয়ার ফুপাত ভাইকে মেডিকেলে ভর্তি করালেন। কিন্তু ছেলেটা বড়লোক বড়লোক বন্ধু পেয়ে আর নেশার জগতে ঢুকে প্রতি মাসে প্রচুর টাকা নেয়। অই টাকার যোগান দিতে যেয়ে উনার নিজের সংসারে টান পড়ে যায়।
কিন্তু এখানেই সব ঝামেলা শেষ হয়নি। এক ফুফাত ভাইকে এত খরচ দিচ্ছে বাকিরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে কেন? আরও ২ ফুপু ছিলেন। উনারাও টাকা আর যায়গা জমির ভাগ বন্টন নিতে চান। রিয়ার আব্বু আম্মু নিজেদের ফ্যামিলির খরচ বাদে বাকি সব বিলিয়ে দিচ্ছিলেন। বড় ফুপুর ছেলেকে যতদিন টাকা দিবে সবাইকে দিতে হবে। জমি বন্টন করে সবার ভাগ দিতে চাইলে কেউ নিতে চায়নি। বাবার সম্পত্তি ভাই ই নাকি পায়? বোনদের এত জমির প্রতি লোভ নেই।
.
এভাবে একার পক্ষে সবার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছিল না উনাদের পক্ষে। তার উপর ঘর থেকে ১ লাখ টাকা চুরি। উনারা মানসিকভাবে ভেংগে পরেছিলেন। টাকার পিছনে ছুটতে গিয়ে মেয়ের ইচ্ছা,অনিচ্ছা,চাহিদা কিছুতেই তারা সময় দিতে পারছিলেন না। তার উপর ৩ ফুফুর কেউ ই এত কিছুতে সন্তুষ্ট না। কেউ যদি জানতে পারে রিয়ার টিউমার এটাকে ক্যান্সার বানিয়ে পারলে রিয়াকে মেরে ফেলবে। আর মানুষ উড়ো কথায় বিশ্বাস করে বেশি। আর যেহেতু গ্রামের সেহেতু ক কে কাক বানাতেও সময় লাগবে না। উনারা প্রতিদিন ই ফোন দিয়ে রিয়ার খোঁজ নিত কিন্তু বাড়িতে না থাকলে দেখা গেসে কেউ এসে কলাবাগান সাফ করে দিবে,কেউ এইটা নষ্ট করবে, অইটা নষ্ট করবে। এক্কেবারে বিচ্চিরি অবস্থা।
.
যাই হোক উনারা শিক্ষিত মানুষ। তারপরও রাজু ছোট মুখে রিয়ার ফ্রেন্ড হিসেবে যতভাবে পারে বুঝানোর চেষ্টা করছে
যারা পিছে লাগে তারা ভাল সময়েই লাগবে,খারাপ সময়েও লাগবে। আমরা তখনই ভাল থাকতে পারব যতদিন পাছে লোকে কি বলে না বলে এগুলাকে কেয়ার না করব।
.
হয়ত রাজুর কথাগুলা উনাদের মনে দাগ কাটে। রিয়া আর আম্মু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাদে।
আর আপাতত কে কি বলল উনারা কেয়ার করছেন না। মেয়ে পাশ করে ভাল জব করে পরেই বিয়ে করাবেন।
.
আসলেই কারো জীবনের একদম কাছাকাছি না গেলে আমরা কখনোই তাকে, তাদেরকে ফিল করতে পারব না।
.
বেচে থাকুক এই বন্ধন, ভাল থাকুক রিয়া, স্বপ্নপূরণ হউক হার না মানা এই তরুণীর,ভাল থাকুক জগতের সকল বাবা-মা
এপারে যারা নেই তারা ওপারে ভাল থাকুক, আমাদের সাফল্য,আমাদের এগিয়ে যাওয়া,ভয়কে জয় করে ক্ষীপ্রগতিতে লক্ষ্যে ছুটা, জয় ছিনিয়ে আনা,বাধা বিপত্তিকে আর পিছে কে কি বলবে তাকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে সাফল্য মুকুট পড়া উনারা ওপারে থেকেই দেখুক। আর স্বার্থহীন দোয়া করে যাক আমাদের জন্য।
আমরা পারব, আমরাই করব জয়,
আজ,নয়তো কাল,নয়তো পরশু
নট শিউরলি বাট ডেফিনিটলি।।
-
লিখেছেনঃ জাবেদ।



0 Comments: