গল্প নং: (২৫)
নামঃ ব্ল্যাকহোল স্ত্রী।
-
“এঙ্গেজমেন্টের দিন! আমি 'জিনিয়ার' হাত ছেড়ে দিয়ে বললাম
'তোমাকে আর ভালোবাসা সম্ভব নয়! আমি নতুন প্রেমে
পড়েছি, নতুন কাউকে ভালোবেসে ফেলেছি। জিনিয়া এক
প্রকার চিৎকার করে বললো 'এগুলো কি বলছো বাবু সোনা!
আজ আমাদের এঙ্গেজমেন্টের দিন।
আমিঃ দেখো তোমাকে আমি ছেড়ে গেলেও ,তোমাকে
ছেড়ে যেতে পারবো না।
.
জিনিয়াঃ মানে?
.
আমিঃ আমি তোমাকে ছেড়েই যেতে পারবো না।
.
জিনিয়াঃ তাহলে বলছো যে, আমাকে আর ভালোবাসবে না, বিয়ে
করবে না।
.
আমিঃ তোমাকে ভালো না বাসলেও, তোমাকেই ভালোবাসতে
হবে।
.
জিনিয়াঃ তুমি কি নেশাদ্রব্য পান করেছো? মদ খেয়েছো?
.
আমিঃ আরে না, তুমি ব্ল্যাকহোল হয়েছো, আর আমি আটকা
পড়েছি ব্ল্যাকহোলের মধ্যে।
'জিনিয়া তড়িঘড়ি করে হটলাইন "৯৯৯" নাম্বারে ফোন করে জানতে
চাইলো তাৎক্ষণিক কেউ পাগল হলে কি করা যায়? আপনারা কি
কোন সাহায্য করতে পারবেন? তারা বললো মশকরা করার জায়গা
পান না?
জিনিয়া বললো পাগলামি করে না কি হয়েছে একটু বলোতো?
কিসের ব্ল্যাকহোল? ব্ল্যাক মানে কালো, হোল মানে গর্ত!
কিন্তু তুমি কালো গর্ত! কি দিয়ে কি! কিছুই বুঝছি না।
.
২.
আমি বললাম, দেখো উপরে যদি এই এঙ্গেজমেন্টের রিং টা
ছুড়ে দাও এটা নিচে আসবে তাই না? এটা যদি আরো জোরে
উপরে পাঠাও তাহলেও এটা নিচে চলে আসবে! এভাবে আরো
জোরে একসময় এমন একটা বেগে ছুড়ে মারলে এটা আর
আসলো না নিচে! তাহলে কি হবে? জিনিয়া বললো, কি হবে
তাহলে?
অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে! উত্তরের অপেক্ষায় সে।
তাহলে হবে 'রিং' টা পৃথিবী ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে
গিয়েছে। এটা কেমন করে হলো? পৃথিবী থেকে খাড়া
উপরে যদি কোন বস্তুকে প্রতি সেকেন্ডে ১১ দশমিক ২
কিলোমিটার বেগে ছোড়া হয় তাহলে এটি আর পৃথিবীতে
ফিরে আসবে না। তাই এই বেগটিকে বলা হয় মুক্তি বেগ (Escape
Velocity)। চিন্তা করে দেখো তো পৃথিবী থেকে কেউ
কোথাও যেতে চাইলে তাকে প্রতি সেকেন্ডে ১১
কিলোমিটার যেতে হবে। মনে করো রকেটে করে আমি
চলেই গেলাম তোমাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। কিন্তু যার যত ভর
তার মুক্তিবেগ ও বেশি। কেমন? যেমন-- বৃহস্পতি গ্রহের
মুক্তিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৫৯ কিলোমিটার। কত বেশি চিন্তা
করেছো? এর কারণ হলো ওই গ্রহের ভর বেশি। এবার একটু
সূর্যের কথা চিন্তা করি! এর মুক্তিবেগ সেকেন্ডে ৬১৭
কিলোমিটার! সূর্য থেকে বেরিয়ে যেতে ১ সেকেন্ডে
৬১৭ কিলোমিটার যেতে হবে? এটা কি সম্ভব তুমিই বলো? জিনিয়া
বললো না সম্ভব নয়। কিন্তু এগুলো দিয়ে তুমি কি বুঝাতে
যাচ্ছো? আমি বললাম উহু! ধৈর্য ধরে শুনতে থাকো।
.
৩.
দেখো বাবু সোনা আমরা জানি, সূর্য হলো সাধারণ মানের তারকা।
এর চেয়েও বাঘা বাঘা তারকা আছে। যেই সুর্যের মধ্যে
আমাদের ১৩ লক্ষ পৃথিবী বসানো যাবে, সেই সূর্য যদি সাধারন
মানের হয় তাহলে এর চেয়ে বিশাল কোন তারকা কেমন হতে
পারে? জিনিয়া বললো হুম ব্যাপারটা জটিল। এখন ধরো এমন একটি
নক্ষত্র আছে যার ভর সূর্যের চেয়ে এত বেশি যে হিসেব
করে এর পৃষ্ঠে মুক্তিবেগ যা পাওয়া গেল তা আলোর
বেগের চেয়েও বেশি। তার অর্থ দাঁড়াবে ঐ নক্ষত্রের পৃষ্ঠ
থেকে নিক্ষিপ্ত আলোও বেরিয়ে
আসতে পারবে না। এখন বলোতো আলো প্রতি
সেকেন্ডে কত কিলোমিটার যায়? জিনিয়া বললো তা তো জানি
না বাবু? কত হবে? আমি একটু তাহাকে বলিলাম, বাবু সারাজীবন ডিম
খেয়েছো ,বার্গার খেয়েছো, এই জিনিস কিভাবে মনে
রাখবে। যাই হোক লক্ষ্য করলাম জিনিয়া মুখ টা ছোট করে
ফেলেছে। আসলে আমি তাকে একটু অপমান করি শুধুমাত্র তার
এই সুন্দর মুখখানা দর্শনের জন্য! আলো ১ সেকেন্ডে যায় ১
লাখ ৮৬ হাজার মাইল। ভাবতে পারো, আলোর গতি গত? রাজশাহী
থেকে দ্রুত গতির একটা গাড়ি ঢাকা যেতে সময় লাগে প্রায় ৭ ঘন্টা।
আর আলো মাত্র ১ সেকেন্ডে পাড়ি দিচ্ছে এতোটা পথ। ঠিক
তেমনি বাবু সোনা আমাদের পৃথিবী থেকে বের হতে
যেমন ওই এঙ্গেজমেন্ট এর রিংটাকে মাত্র ১১ কিলোমিটার
লাগবে! ঠিক তেমনি ব্ল্যাকহোলের মধ্য থেকে বের হতে
আলোর চেয়েও বেশি বেগ লাগবে। এবার তুমিই বলো,
আলোর চেয়ে কোনকিছু দ্রুত চলতে পারে? জিনিয়া
বললো, হুম পারে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি জিনিয়ার দিকে,
এই মেয়েটা কি পাগল? যেখানে পুরো বিজ্ঞানজগৎ প্রমান
করে দেখিয়েছে আলোর চেয়ে কোন কিছু দ্রুত চলতে
পারে না, আর এই পাগলি মেয়েটা বলে কি? আমি বললাম সেটা
কোন বস্তু বলবে? সে বললো আমার 'মন' এর গতি, আমার
মনের গতি এতোটাই যে এখান থেকে আমি ভাবি সিডনির
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টের হেড হয়েছি। আমি
মুচকি একটা হাসি দিয়ে বললাম বিজ্ঞান নিয়ে ফান করো না। তো
যেহেতু আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে কোনকিছু যেতে
পারে না সেহেতু ওই ব্ল্যাকহোল থেকে বের হতে
আলো পারে না। আলো টাও আটকে যায়। তাই ওখানে কোন
আলো নেই। কিন্তু ভিতরে হয়তো আলো আছে। কিন্তু
উপরে দেখা যায় এটা একটা কালো গর্তের মত। আর সেই
ব্ল্যাকহোল টাই তুমি!!
.
৪.
জিনিয়া একটু কান্না কান্না ভাব নিয়ে বললো, আমি ডিম খাই তাই বলে
আমাকে ব্ল্যাকহোল বানিয়ে দিলে? আমি আলোও খেয়ে
ফেলি? কি খেয়েছি তোমার বলো? অন্য মেয়েরা তাদের
বিএফ এর টাকা খেয়ে নিচ্ছে, আর আমি তোমাকে চকচকে
টাকার নোট দিয়েছি। প্রায় মাসে আমিই টাকা দিয়েছি তোমাকে
বার্গার আর স্পিড খাওয়ার জন্য! আমি জিনিয়ার মুখে হাত দিয়ে বললাম,
গোপন কথা কেনো ফাঁস করে দিচ্ছো? আমি যা বুঝলাম সেটা
নয়; শুনো -- ব্ল্যাকহোল তো বুঝলে। এই ব্ল্যাকহোলের
মধ্যে চলে গেলে আর ফিরে আসা সম্ভব না।
ব্ল্যাকহোলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে যা তোমার মধ্যে
বিদ্যমান। আমি সেগুলো বলছি একটু মিলিয়ে দেখো->
"তোমার ভালোবাসার ভর এতোটাই বেশি যে, তোমার
মুক্তিবেগ ও বেশি, তোমার কাছ থেকে আমি ছুটে যেতে
চাইলেও আমি পারবো না! কেনোনা প্রতি সেকেন্ডে হাজার
মাইল গতি নিয়ে যেভাবে ব্ল্যাকহোল থেকে বের হওয়া যায়
না। ঠিক সেভাবেই তোমার ভালোবাসার এতোটা পাওয়ার যা আমার
কোন গতি দিয়েই আমি তোমাকে ছাড়তে পারবো না। আমি
তোমার থেকে মুক্ত হতে চাইলেও মৃত্যু ছাড়া মুক্ত হওয়া সম্ভব
না। আর প্রত্যেকটা ভালোবাসা স্বামী স্ত্রীর বন্ধন এমন
হওয়াটাই উচিত। ব্ল্যাকহোলের আছে কয়েকটি স্তর-
ক) ব্ল্যাকহোলের একটা স্তর হলো ঘটনা দিগন্ত। এখানে
গেলে আর ফিরে আসা যাবে না, ঠিক তেমনি আমি যদি বিয়ের পর
তোমাকে একের পর এক চাপ দিই, তাহলে তুমি বিপদজনক আকার
ধারণ করবে! তুমি আমাকে টেনে নিয়ে যাবে । তাই তোমাকে
চাপ দেয়া যাবে না।
.
খ) আর একটা স্তর আছে সেটা হলো - এখানে একটু নড়বড়ে
হলেই সমস্ত কিছু নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ব্ল্যাকহোল
ক্ষেপে যেতে পারে। তাই এখানে দক্ষ ভাবে চলতে হবে।
ঠিক তেমনি এটা হলো আমাদের বিশ্বাস। এটা খুব দক্ষ ভাবে
পরিচালনা করতে হবে। তোমার বিশ্বাস যেনো আমি নষ্ট না করি
সেইটা আমাকেই দক্ষ ভাবে মেইনটেইন করতে হবে। বিশ্বাস
যদি নষ্ট করে দিই, তাহলে হয়তো তুমি কঠিন আকার ধারণ করতে
পারো।
.
গ) এইটা হলো ভারসাম্য স্তর। এখান থেকে ব্ল্যাকহোল দেখা
যাবে, এখান থেকে আমরা ফিরেও আসতে পারবো। এটা
হলো নিরাপদ অঞ্চল। এর অর্থ হলো! পুরো পৃথিবী যদি আমার
কাছে অসহনীয় হয়ে উঠে, কিন্ত তোমার কাছে এসে
যেনো আমি সহনীয় হয়ে উঠি। জীবনের সমস্ত দু:খ এসে
যদি ভর করে আমার মনে, আমি যেনো তোমার কাছে গিয়ে
সুখি অনুভব করি।
এই হলো ব্ল্যাকহোলের সাথে আমার ভালোবাসা। আর সেই
ব্ল্যাকহোল টাই তুমি।
.
৫.
'জিনিয়া খুশিতে তার মুখখানা ঝলমল করছে। সে বললো, আমি
তোমাকে পাগল ভেবে '৯৯৯' এ ফোন করেছিলাম! কিন্তু
তোমার মস্তিষ্কে বিজ্ঞানসম্মত ভালোবাসা দেখে সত্যিই
আনন্দ লাগছে গো। কেনো যেনো আমার মনে হলো
ওকে একটু আবার রাগানো যাক। আমি বললাম , বাবু সোনা এটা
আসলে কিছুই না, আসল ব্যাখা টা শুনো; তুমি যেমন ডিম, চিকেন,
গো-মাংস', পালংশাক, লালশাক, নুডলস, আলু ভর্তা থেকে শুরু করে
সব রকম ভর্তা! এছাড়া মিষ্টি জাতীয় খাবার, টক জাতীয় খাবার, আবার
ফুসকার ঝাল জাতীয় খাবার ও নিস্তার দাও না! রুই মাছ থেকে শুরু
করে যত প্রকারের মাছ সব তোমার পছন্দের লিষ্টে, যা পাও
তাই সাবাড় করতে থাকো, সমস্ত খাবার পাকস্থলীতে জমা করে
রাখো। এই জায়গায় ব্ল্যাকহোলের সাথে তোমার মিল আছে,
ব্ল্যাকহোল যা পায় তাই নিজের কাছে টেনে নেয়, এমনকি
আলো এতো ক্ষুদ্র তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ওর থেকে বের হতে
পারে না! এই জায়গাতে এতো মিল তোমাদের যা ভাবতে
গেলেই শরীর শিউরে ওঠে। এতোক্ষন যা ব্যাখা দিলাম
এগুলো চেয়ে এটাই হলো আসল ব্যাখা। জিনিয়া তাহার নরম দুখানা
হাত দিয়ে আমার মাথার চুল মুঠোবন্ধী করে নিলো। আমি
ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, "ব্ল্যাকহোল স্ত্রী হবে?"
.
লিখেছেনঃ আতিক হাসান।
Author: Jahid
Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.



0 Comments: