সারপ্রাইজড

গল্প নং: (২৬)
নামঃ সারপ্রাইজড।
-
ফুচকা খেতে খেতে সেদিন রেণু আমাকে বলেছিল যেন আমাদের সম্পর্কের কথাটি আমি আমার বাসায় বলি! ওর বাসা থেকে না কি ওকে অনেক চাপ দিচ্ছে বিয়ের জন্য! কোন কিছু না করলে চিরতরে ওকে হারানোর একটি সম্ভাবনার দিক তুলে ধরে,রেণু আমাকে যুক্তি দিয়ে সেটা বুঝিয়েও দিয়েছিল! কথাগুলো সেদিন আমি শুনেছিলাম ঠিকই, কিন্তু অতটা সিরিয়াসলি নেইনি! সেটাই আজ কাল হয়ে দাড়িয়েছে আমার জন্য! বাবাকে আর রেণুর কথা বলাই হয়নি! তাই, নিজের চুল আজ নিজেই ছিড়তে ইচ্ছে করছে আমার!!
.
বাসায় রেণুর কথা বলতে না পারার এক নাম্বার বাঁধা হলেন বাবা..! তাঁর ইচ্ছের বিপরীতে কোন কিছু হলে বাড়ির দেয়ালে ঝুলে থাকা বন্দুক তাঁর কঠোর হাতে এসে শোভা পায়! তখন গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, কথাগুলো ভেতরেই আটকে থাকে! শত চেষ্টা করেও এগুলো আর বের করা যায় না! পরিশেষে কথাগুলোও আর বলা হয়ে উঠে না!!
.
এদিকে আজ রেণুর বিয়ে। টেনশনে একদম মাথা ছিড়ে যাচ্ছে! তাহলে কি আমাদের পাঁচ বছরের সম্পর্কের এখানেই সমাপ্তি! বিষয়টি কোনভাবেই মেনে নিতে পারছি না আমি। ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে!!
.
খেয়াল করে দেখবেন, মানুষ যখন কোন টেনশনে থাকে, তখন তার চেহারাতে সেটা ভেসে উঠে! কেউ চেহারাতে তাকিয়ে দিব্যি বলে দিতে পারে লোকটি কোন টেনশনে আছে! দুলাভাই আমার চেহারা দেখে বোধহয় এটা বুঝতে পেরেছেন। তিনি বললেন:
.
-'কি রে.. any problem?'
.
আমি বললাম: তেমন কিছু না,রেণুর আজ বিয়ে,ওর ফোন বাসা থেকে নিয়ে নিয়েছে! তাই জানাতে পারেনি! এক কাজিনের নাম্বার দিয়ে ফোন দিয়ে এখন জানাল!..
.
কি থেকে কি হল আমি বুঝতে পারলাম না। দুলাভাই একটা অট্রহাসি দিয়ে বললেন:
.
-' প্রণয়,তোর গার্লফ্রেন্ডের বিয়ে আজ,আর তুই এখনও এখানে বসে আছিস! বসে বসে টেনশন করছিস কি করবি? তোর স্থানে আমি হলে শোনা মাত্রই গাড়ি নিয়ে উধাও হতাম তাকে নিয়ে আসতে বুঝলি?.. হো.. হো..হো!'
.
দুলাভাইয়ের এ হাসিটি কেমন যেন রহস্যজনক ঠেকল আমার কাছে! দুলাভাইকে আমি যতটুকু চিনি,তিনি যত দুষ্টোমিই আমার সাথে করুক না কেন, কোন সিরিয়াস বিষয়ে অট্রহাসি দেয়ার লোক তিনি নন! কেমন যেন রহস্যর গন্ধ পেলাম। কিন্তু রহস্য উম্মোচন করা কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না আমার! সব হিসেব কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে এল আমার কাছে! এবারে টেনশন আর একটু বেড়ে গেল!!
.
আমার ভাবনার পর্দায় আঘাত হেনে দুলাভাই বললেন:
.
-'আছে সাহস? গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে বাড়িতে গিয়ে সবার সামনে থেকে নিয়ে আসার??.. আছে??'
.
আমি নির্বাক হয়ে দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তখন মুখ দিয়ে কিছু বের হল না! বাবার বন্দুকের কথা মনে হলেই গলা যে আমার শুকিয়ে যায়। আমার এ অবস্থা দেখে দুলাভাই আগ্রহ হারিয়ে বললেন:
.
-'হবে না, হবে না প্রণয়! তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না! এ সাহস নিয়ে রেণুর মত মেয়ের সাথে প্রেমটা কিভাবে করলি তা আসলেই আমি মেলাতে পারছি না!!'
.
এই বলে দুলাভাই তাঁর প্রিয় ম্যাগাজিনে চোখ বুলাতে লাগলেন! আর এদিক দিয়ে আমার নিজের উপরেই আমার রাগ হচ্ছিল! আসলেই তো, আমাকে কি এ যুগের বয়ফ্রেন্ড ভাবা যায়? যে গার্লফ্রেন্ডের বিয়ের কথা শুনেও নীরবে বসে থাকতে পারে একদম প্রাণহীন মূর্তির মত,যারা কোন কিছুই করতে সক্ষম নয়!!
তাই বুকটা ফুলিয়ে আমি বলে ফেললাম:দুলাভাই আমি পারবো!
দুলাভাই এবার আমার দিকে তাকিয়ে জোশে বলে উঠলেন :
.
-'...এই না হলে আমার শালা! হো..হো..হো.!'
.
দুলাভাই তখন ড্রাইভারকে ফোন দিয়ে গাড়ি রেডি রাখতে বললেন, আর আমাকে বললেন মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বরের সাজে সেজে প্রস্তুত হতে! তারপর বুয়াকে ডাকিয়ে সেসব কাপড়ও আনিয়ে দিলেন। বর সাজার কাপড় কোথা থেকে এল, আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিতেই দুলাভাই মুচকি হেসে বললেন:
.
-'তুই সে বাড়িতে বরের সাজে যাবি রেণুকে বউ করে বাসায় নিয়ে আসতে তাই না? তাই তোকে বর সাজতে হবে,বর! আর শেরওয়ানী, বর সাজার সব সামগ্রী কোথা থেকে এসেছে তা তোর কাছে গোপন থাকবে সারপ্রাইজড হিসেবে,সেটা সময় মত তুই পেয়ে যাবি! যা দ্রুত তৈরী হয়ে নে,আর কথা বাড়াস না!'
.
এই বলে দুলাভাই দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। কিছু বলতে গিয়েও সুযোগ পেলাম না! অগত্যা বিস্ময়তার সাগরে আর একবার ডুব দিতে হল আমাকে। এ বিস্ময়তার সাগর যে অনেক গভীর!!
                .
কিছুক্ষণ পর দুলাভাই তৈরী হয়ে এলেন। একদম বিয়ে বাড়িতে খেতে যাচ্ছেন যেন এমন ভাব! আমাকে রেডি দেখে বললেন:
.
-'যাক, বেশ মানিয়েছে তোকে,একদম আসল জামাই!'
.
তারপর আর দেরী করতে না বলে দ্রুত নিচে আসতে বললেন! আমি বললাম: দুলাভাই কাজটি কি ঠিক হবে?
দুলাভাই বললেন:
.
-'কোন কাজটি?'
.
-এই যে রেণুকে ভাগিয়ে আনা!
.
এ কথা শুনে দুলাভাই আমার হাতে টান দিয়ে নিয়ে গেলেন। বুঝতে পারলাম দুলাভাই বিষয়টিতে আসলেই অনেক সিরিয়াস! তাই আর কিছু বলতে গেলাম না! তিনি যা প্লান করেছেন সে রকমই আমায় মানতে হবে আজ। কোন উল্টো কাজ তিনি করবেন না সে ভরসা তাঁর উপর আমার রয়েছে!
                   .
দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আমরা এখন রেণুদের বাসার গেইটের সামনে দাড়িয়ে। চারদিকে বিয়ে বাড়ির আমেজ! দুলাভাই ড্রাইভারকে গাড়ি ভেতরে ঢোকাতে বললেন। আমি আপত্তি করতেই দুলাভাই চুপচাপ বসে থাকতে উপদেশ দিলেন,আর কি হয় তা নোটিশ করতে ইংগিত করলেন! আমি তাই করলাম! কোন কিছুই মাথায় ঢুকছিল না,ভয়ে চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল!
.
তারপর বাড়ির ভেতরে এক জায়গায় গাড়ি এসে থামল। চোখ খুলে দেখি আমার বাবা-মা,বড় আপা,রেণুর মা-বাবা,রেণুর বড় ভাই,রেণুর ভাবি সকলেই হাসিমাখা মুখ নিয়ে দাড়িয়ে আছে আমাদের আসার অপেক্ষায়! নিজের চোখকে ঠিক বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না আমি! মানুষ যখন ভাবনাতীত কিছু দেখে,নিজেকে স্বপ্নে আছে বলে নোটিশ করে। আমারও ঠিক একই অবস্থা হল! চারদিকে স্বপ্নের বাঁজনা বাঁজতে লাগল,বাস্তবেরা সেখানে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় ময়দান ছেড়ে পালালো!!
.
দুলাভাই গাড়ি থেকে বের হয়ে আমাকে নামালেন,সাথে রেণুর বড় ভাই আসলেন! চোখটি মুছে নিয়ে আবার দেখলাম! না ঠিকই দেখছি, ঐ তো রেণু বউ সেজে বসে আছে। পাশে আমার ফ্যামিলি আর ওর ফ্যামিলির লোকজন। বেশ সুন্দর লাগছে শাড়িতে ওকে! মুহূর্তের জন্য আমি যেন হারিয়ে গেলাম! পাশ থেকে দুলাভাই বললেন:
.
-' কিরে! সব প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিস?'
.
আমি না সূচক মাথা নাড়ালাম,একটি প্রশ্নের উত্তর এখনও পাইনি। দুলাভাই বললেন:
.
-' কোনটার?  শ্বশুর আব্বা'কে মানালো কে তাই তো?' 
.
আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ালাম। তখন দুলাভাই রেণুর দিকে ইশারা করে বললেন:
.
-'প্রণয়! জীবনে তুই আর যাই পেয়েছিস আর না পেয়েছিস,রেণুর মত বউ পেয়েছিস মানে   সব পেয়েছিস!'
.
আর হো..হো.. হো.. করে দুলাভাই তাঁর চেনা হাসিটা আমায় আবার উপহার দিলেন। আর কি রহস্য দুলাভাই তাঁর এ হাসিতে লুকিয়ে রেখেছে কে জানে! আপাতত এগুলো ভাবার সময় নেই আমার। রেণুকে একবার ভাল করে দেখে নেয়া যে আমার খুব প্রয়োজন! শুনেছি বউয়ের সাজে গার্লফ্রেন্ডকে দেখতে না কি অসম্ভব সুন্দর লাগে! এ সৌন্দর্য যে আমি আজীবন দেখে যেতে চাই..!

..
লিখছেনঃ যাইন খান।


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 Comments: