গল্প নং: (২৪)
নামঃ অপেক্ষা।
-
সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত...
.
খুব ভালো পরিবার থেকে অনিতার জন্য এ পর্যন্ত পাঁচ খানা সম্বন্ধ আসে।অনিতা এখন বিয়ে করবে না বলে সবগুলো বিদায় করে।সে এখন পড়ালেখা করতে চায়।এগুলো সব অভিনয়।আমার জন্য মেয়েটা প্রতিনিয়ত এসব অভিনয় করে যাচ্ছে।অনিতা খুব একটা অদ্ভুত মেয়ে কতবার বলছি-চলো পালিয়ে বিয়ে করে নিয়।কিন্তু না, কে শুনে কার কথা।অনিতার মুখে একটাই কথা তোমাকে আমি ভালোবাসি তবে পালিয়ে বিয়ে করতে পারবো না।কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমি আর অন্য কাউকে জীবনসঙ্গী করবো না।আমি চাই না আমার জন্য আমার বাবা সমাজে মাথা নিচু করে চলাপেরা করুক!
.
অনিতাকে খুব ভালোবাসি।মায়ের কাছে বায়না ধরছি বাবা যেনো তাদের বাড়িতে বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে যায়।বিয়ের সম্বন্ধ কোন মুখে নিয়ে যাবে?আমি 'তো এখন ও বেকার।বাবা ছোটখাঁটো একজন ব্যবসায়ী।আমি পড়াশুনা বেশি দূর করি নাই কিন্তু হাতের একটা কাজ খুব ভালো জানি সেটা হচ্ছে- ইলেকট্রিক কাজ।রাত হলে বাবা কাজর্কম শেষ করে ঘরে ফিরে আসে।মা সত্যি মনে হয় অনিতার কথা বলছে বাবাকে।বাবা সকাল বেলায় ব্যবসার কাজে যাওয়ার আগে অনিতার বাড়িতে যায়।অনিতার বাড়ি আমাদের থেকে বেশি দূরে না এই ২ কিলোমিটার হবে।বাবা তাদের বাড়িতে গিয়ে কথা বলে আসে। এখন শুধু রাতে বাবা আসার অপেক্ষা আছি।বাবা মেবি অনিতার বাবাকে বলছে আমরা দুইজন দুইজনকে পছন্দ করি।এখন শুধু অনিতা আমাদের ঘরে বউ সেজে আসার পালা!
.
আমার বাবা রাতে ফিরে আসলে তখন বুঝলাম সত্যি এমন করে তাদের বলছে।তবে অনিতার বাবা অনিতাকে এখন বিয়ে দিবে না।তার বাকি পড়ালেখা শেষ করলে আমার হাতে তুলে দিবে।তবে আমার কাছে সে যোগ্যতা থাকতে হবে।আমার বাবাকে যখন এগুলো বলে বাবা সেদিন ঠিক করছে আমাকে প্রবাসে পাঠাবে।প্রবাস থেকে আসলে আমাদের বিয়েটা হবে।তাছাড়া ইলেকট্রিক কাজ আমার জানা আছে প্রবাসে গেলে কিছু একটা করতে পারবো সে চিন্তা করে বাবা পাশের গ্রামের মাজেদা খালার স্বামীর সাথে কথা বলছে।
হামিদ অাঙ্কেল বেশ ভালো মানুষ উনার হাত ধরে অনেক ছেলে প্রবাসে গেছে।উনাকে বলাতে উনি আমার জন্য কোম্পানির একটা ভিসা কিনে রাখে।পাঁচলক্ষ টাকা দেওয়ার পরে হামিদ আঙ্কেল বাবার হাতে ভিসা তুলে দেয়।এখন শুধু টিকিট এর তারিখ এর জন্য অপেক্ষা।প্রবাসে আসার কিছুদিন আগে বন্ধুরা বলাবলি করতেছে-অনিতা নাকি আমাকে ভুলে যাবে।সে আমার জন্য অপেক্ষা করবে না।তার পড়ালেখা শেষ হওয়ার পরপরে বিয়ে দিয়ে দিবে।আমার বন্ধু হয়তো জানে না?আমি এমন এক মেয়েকে ভালোবেসেছি সে আমি আসার অপেক্ষা দিন এরপর দিন গুণতে থাকবে তু্ুবুও অন্যর হাত ধরবে না।শুধু তাই না অনিতাকে অচেনা নাম্বার থেকে কেউ কল দিলে অনিতা বলে- হ্যাঁ আমি অনিতা বাহদুর বলছি।কি বলবেন তাড়াতাড়ি বলুন।এ কথাটা যখনই শুনি তখনই কেমন জানি ভালো লাগা শুরু করে।
অামি জানি সে আমার জন্য অপেক্ষা করবে।
.
কিছুদিন পরে মা,বাবা,প্রিয় মানুষটাকে ছেড়ে স্বপ্ন পূরণের সে যায়গা চলে আসছি আমি।
শুরুতে প্রবাস জীবন বেশ ভালো যাচ্ছিলো।
বছর ঘুরতে না ঘুরতে আবার আমার ভাগ্যের চাকা থেমে গেলো।কোম্পানি হঠাৎ করে
সবকিছু বিক্রি করে অন্য দেশে চলে যায়।তার চলে গেলেও বা কি আমাদের মতো কর্মকারী চল্লিশ পঞ্চাশ জন মারা গেলে তাদের কি?
হয়তো কিছুই যায় আসে না তাদের।সবার হাতে পার্সফোট ধরিয়ে দিয়ে বলে-তোমরা সবাই ক্যানচেল আজ থেকে।টিকেট নিয়ে নিজের দেশে চলে যাও।কি আশ্চর্য
৫ লক্ষ টাকা খরচ করে পরিবার পরিজনকে ছেড়ে নিজের ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে স্বপ্ন পূরণ করতে অচিনদেশে আসছি আর সেটা পূরণ না করে কি চলে যাবো? না আমি যাবো না।নিজুয়া নামক যায়গা থেকে পালিয়ে সানাইয়া শহরে চলে আসি।ভিনদেশের পরিচয় পত্র হিসেবে আমার সাথে আছে মাতৃভূমির পরিচয়টুকু।পার্সফোট এ বড় বড় অক্ষরে লিখা আছে-
মো:সায়মন বাহদুর।
বাবা-ইরফান বাহদুর।
মাতৃভূমি-বাংলাদেশ।
জন্মস্থান -চট্রগ্রাম।
.
নামের পাশে বাহদুর ঠিকে আছে কিন্তু আমি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াইয়।আমার কাছে এতটুকু পরিচয় আছে অালহামদুলিল্লাহ্।এমনও লোক আছে তাদের নাই কোনো পরিচয় পত্র।যাকে বলে অজ্ঞাতনামা।মা,বাবা নিজের মাতৃভূমি থাকার পরেও যদি নিজের পরিচয় না দিতে পারে তাদের কেমন লাগে?হয়তো খুব কষ্ট লাগে ঠিক সে অজ্ঞাতনামা মানুষগুলোর কষ্ট লাগতেছে।ভিষণ কষ্ট তাদের মনে।আমার ভিনদেশের কোনো পরিচয় পত্র আমার কাছে নাই।সবকিছু রেখে আসছি কোম্পানির ম্যানেজার এর কাছে।অনেক রিকুয়েস্ট করছি অাঙ্কেল কে আমার পরিচয় পত্র এর কাগজ গুলো দেওয়ার জন্য।উনি তো কাগজ দিলেন না উল্টা ধমক দিয়ে বলে- get out of here lazarusকি আশ্চর্য! ৫লক্ষ টাকা বিনিময় আজ এ গালি শুনতে হচ্ছে। শুনতে হচ্ছে আমি নাকি একজন ভিক্ষারী।সব মুখ বুঝে সহ্য করে সানাইয়া শহরে নিজ গ্রামের কিছু আত্মীয়র কাছে সাড়ে চারবছর ছিলাম।অনেকবার পুলিশ এর দৌড়ানি পর্যন্ত খেয়েছি।তাদের ভয়ে পাহাড়ের গুহায় রাত পর্যন্ত কাটাতে হতো আমায়।
.
মা অনেকবার বলছে- তোর কি বেশি কষ্ট হচ্ছে নাকি?উত্তর একটাই দিতাম- না মা আমি ঠিক আছি।বেশ ভালো আছি।মা বিশ্বাস করে নিতো আমার কথা।অনিতা প্রায় সময় বলতো এভাবে লুকিয়ে আর কতদিন?উত্তর একটাই দিতাম- আর অল্পকিছু দিন আছে।এরপরে নিজ দেশে চলে আসবো।নিজ দেশে চলে আসা কি এতো সহজ?হয়তো কঠিন এর চেয়ে কঠিন।সাড়ে চারবছর থাকার পরে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করি।তারা ১২দিন যাবত অনেক কষ্ট দিয়েছে আমাকে।এ ১২ দিনের কষ্ট মনে হয় আমি ১২ বছরেও পাই নাই।তারপরেও আমি হ্যাপি কারণ নিজ মাতৃভূমি আসতে পেরেছি।খু্ব ভোর বেলায় বিমান ল্যান্ড করছে।সূর্যি মামার অালোতে চিকচিক করতেছে পুরা চট্রগ্রাম এয়ারপোর্ট।পাখিদের কিচিমিচি শব্দ।বাহিরে এসে দেখি বাবা দাঁড়িয়ে আছে।খুব দ্রুতগতি হেঁটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।আমিও খুব কাঁদছিলাম।নিজের মন শক্ত করে বাবাকে বলি-
.
_বাবা আমিতো এসে গেছি আর সমস্যা নাই। চলো বাড়িত ফিরে যাই।
_হ্যাঁ চল,ঐদিকে ভাড়া চলিত গাড়ি আছে।
.
গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম বাড়ির দিকে খু্ব তাড়াতাড়ি বাড়িত চলে আসি।মা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।মাকে কেউ থামাতে পারছে না।মা শুধু কেঁদে যাচ্ছেন।কি বলে মাকে শান্তনা দিবো তার কোনো ভাষা আমার কাছে নাই।তারপরেও কান্না কণ্ঠে বলি-
.
_মা থামো অনেক কাঁদছো আর না।এখন তো আমি চলে আসছি তোমার কোলে।চলো মা ভাত দাও খু্ব ক্ষুধা লাগছে।
_হ্যাঁ বাপজান,গোসল করে রান্না ঘরে আয়।
.
দুপুরবেলা খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়।বড় ক্লান্ত ছিলাম কখন চোখ বয়ে ঘুম এসে গেলো বুঝতে পারি নাই।পরেরদিন বিকালে চলে গেলাম অনিতার সাথে দেখা করতে।অনিতা উঠানে বসে আছে।আমাকে দেখে অনিতা রুমে চলে যায়।আঙ্কেল আন্টির সাথে রুমে বসে কথা বলতেছি।কিছুক্ষণ পরে অনিতা রুম থেকে বাহিরে আসে।অনিতার চোখ লাল হয়ে আছে।পাগলী হয়তো রুমে বসে বসে এতক্ষণ কাঁদছে।আশ্চর্য সবাই কাঁদতেছে
কেন? আমিতো চলে আসছি।অনিতা তার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে। কোনো কথা বলতেছে না।মেয়েটা অাসলে লজ্জাবতী কেউ কথা বললে কথা বলে না হলে নিজ থেকে বলে না।কিন্তু নিজ থেকে সবাইকে বেশি ভালোবাসে।একটু হাসি দিয়ে আমি বলি-
.
_অনিতা কেমন আছো?
_হ্যাঁ ভালো অাছি,আর তুমি কেমন আছো
_এইতো এখন বেশ ভালো আছি।
.
তার বাবার সামনে আর বেশি কথা বলতে পরলাম না।বলতে পারলাম না তুমি একজন ধৈর্যবতী মেয়ে। আমাকে ভালোবেসে আমার জন্য সাড়ে চার বছর যাবত অপেক্ষা করছো।
আর তুমি অপেক্ষা করতে হবে না এ অল্পকিছু দিনপর তোমার আমার মিলন হবে।অনিতার বাবা মায়ের সাথে কথাবার্তা বলে আবার বাড়িত চলে আসছি।
.
তার বাবা কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম অনিতাকে আমার হাতে তুলে দিতে রাজি।এ মাসে বিয়েটা হয়ে গেলে ভালো মনে করেন উনি। তারপরেও বিয়ের আগে আমি একটা চাকরীতে জয়েন্ট করতে চাই।কিছুদিন ঘুরাপেরা অবসরে দিন যায় আমার।একদিন সকালে চট্রগ্রাম থেকে বন্ধু রাজিব ফোন করে বলে -
.
_দোস্ত চাকরী করলে আসিস।স্যারকে বলে তোর জন্য চাকরি একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবো।
রাজিব এর কথা শুনে আবার চট্রগ্রাম রওনা দিলাম।গ্রামীণফোন অফিসে কাজ।১২ হাজার টাকা বেতন আবার এক্সটা ট্রিট ও পাওয়া যাবে মাঝে মধ্যেয়।চাকরি'তে জয়েন্ট হয়ে যাই।
আমাদের কাজ ছিলো গ্রামীণ টাওয়ার ইলেকট্রিক এর।আমাদের টিম এ ২০ জন কাজ করে।পড়াশুনার পাশাপাশি ইলেকট্রিক কাজ শিখাতে আজ কাজটা পেয়েছি।সকাল না হতে অনিতার ফোন-
.
_এখন ও কি ঘুমে তুমি?
_না,এইতো এ মাত্র ঘুম থেকে উঠছি।আজকে একটু কাজ অাছে বাহিরে।
_ও আচ্ছা,তাহলে কাজে যাও।
_অনিতা?
_হুম বলো-
_অনেকদিন আমার জন্য অপেক্ষা করছো।আর ১ মাস অপেক্ষা করতে পারবে না?
_হ্যাঁ পারবো।
.
অনিতা হ্যাঁ বলতে গিয়ে মনে হয় লজ্জা পেয়েছে।হ্যাঁ বলার সাথে সাথে ফোনটা রেখে দেয়।বাহিরে হালকা হালকা বৃষ্টি।বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা আছি আমরা চরজন।বৃষ্টি থেমে গেলে কাজের উদ্দেশ্য রওনা দিয়।উঁচু টাওয়ার খুব একটা ভয় লাগে উঠতে ওখানে।তারপরেও বুকে শাহস রেখে আস্তে আস্তে উপরে উঠে গেলাম।খুব দ্রুত কাজ ও শেষ করলাম।
তাড়াহুড়া করে নিচে নামতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যাই।এতটাই উপর থেকে পড়ছি আমি সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি।বন্ধুরা ধরে যখন আমাকে গাড়িতে তুলে তখন আমার জ্ঞান ফিরিয়ে আসে।রাজিব কাঁদতেছে,
পাগল বন্ধুটার চোখে কখনও জল দেখি নাই।সবাইকে বিনোদন দেয় সে বন্ধুটার চোখে পানি আমার জন্য।
.
আমার খুব বেশি তৃষ্ণা লাগছে ।কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ করে বলতে পারছি না-কেউ একটু পানি দিয়ে যাও?আশ্চর্য মায়ের কথা মনে পড়ে গেলো।রাত ২টা,৩টা যখনই চিৎকার দিয়ে বলতাম -মা ও মা পানি দাও।আমার মা উঠে আমাকে পানি দিয়ে যেতেন।আজ শেষ নিশ্বাসটুকু চলে যাচ্ছে মায়ের হাতে তো নিজের তৃষ্ণা মিটাতে পারলাম না।আমার চোখ দুইটা বন্ধ হয়ে আসছে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি ঝাপসা ঝাপসা দেখতে পাচ্ছি। পাখি দুইটা ডানা মেলে উড়তেছে।খুব ইচ্ছা করছে পাখির মত উড়াল দিয়ে অনিতার কাছে গিয়ে মাফ চাইবো আর বলতাম- তুমি এতদিন যার জন্য অপেক্ষা করছো সে মানুষটা তোমাকে ছেড়ে একা চলে যাচ্ছে।কিন্তু অনিতা'কে সে কথাটাও বলতে পারলাম না।নীল আকাশ কেমন জানি কালো দেখা যাচ্ছে।কি অদ্ভুত নীল আকাশ কিভাবে কালো হয়?হয়তো নীল আকাশ ও আমার উপর অভিমান করছে।আমি আর কিছুই দেখতে পাচ্ছি না চারদিকে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার!
.
জীবনের গল্পটা আমার রুমমেট এর"
.
লিখেছেনঃ মো:ইমরান হোসাইন "



0 Comments: