বুকের বাঁ পাশে

গল্প নং: (২৩)
নামঃ বুকের বাঁ পাশে।
-
ছয় বছর পর সুফিয়ার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি । এমন ভাবে তার সাথে আমার দেখা হবে  যা আমি কখনোই চাইনি । সুফিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে তার মেয়ে । সুফিয়ার পড়নে সাদা শাড়ী ।এই ছয় বছরে অনেক শুকিয়ে গেছে সে  । চোখের নিচে কালো দাগ পরেছে । চেহারাটা কেমন জানি মলিন হয়ে গেছে ।
.
দুই জনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ,কেউ কোন কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না । প্রথমে  সুফিয়া কথা বলে নিরবতা ভাঙ্গে । সে বলে ,
-  বিদেশ থেকে কবে ফিরলে ।
.
= দুইদিন হয়েছে দেশে ফিরলাম ।
.
- ও আচ্ছা ,তা কেমন আছো ।
.
= হ্যাঁ ভালো আছি , তুমি কেমন আছো ?
.
- অনেক ভালো , এতোটা ভালো যে সুখ  সহ‍্য হচ্ছে না এখন আর ।
"এই কথা বলে সে মুখ ফিরিয়ে নেয় অন্য দিকে ।
.
= তুমি  কি  আমার ওপর এখনো রেগে । আমাকে কি ক্ষমা করতে পারো না ।
.
- এই বিষয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না ।
তবে একটা কথা জেনো রাখো , আমার যে সুখের জন্য তোমার জীবন থেকে  আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে । সেই সুখের দেখা আমি এখনো পাইনি ।
" তার এমন কথা শুনে আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দই বের হচ্ছিল না ।
.
তার মেয়ে তাকে   জিজ্ঞেস করে -
উনি কে মা?
সুফিয়া বলে - উনি  সেই লোক মা  যে আমার বুকের বাঁ পাশে ,  তোমার সাথে বাস করে।
.
" এই বলে মেয়ে কে নিয়ে  সেখান থেকে বিদায় নেয়  ।

----------

সাত বছর আগে তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয় । 
একদিন আমি আর আমার কিছু বন্ধু একটা চায়ের দোকানে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম । রাস্তা দিয়ে কোন মেয়েকে যেতে দেখলেই তাকে উদ্দেশ্য করে গান গাইতাম ।
পালাক্রমে একবার একজনে গান গাইত । এরপর  ছিল আমার পালা আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে মেয়ে আসার অপেক্ষা করছিলাম ।
কিছুক্ষণ পরে একটা মেয়ে কে  আসতে দেখলাম ।আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি সিগারেট টানতে টানতে গান গেয়ে উঠলাম  - বলোনা আমায় তুমি , হবে আমার চিরদিনই ।
আমার গান শুনে হঠাৎ মেয়েটা থমকে দাঁড়ায় ,
তারপর সে আমার দিকে আসতে থাকে ।
আমি তখন খুব ভয় পেয়ে যাই , যদি সবার সামনে আমাকে থাপ্পড় মেরে বসে , তাহলে তো  আমার ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যাবে ।
মেয়েটা আমার সামনে এসে দাড়িয়ে বলে -
গলা ভালো বা খারাপ হোক গান সবাই গাইতে পারে । এটা কোন দোষের কিছু না । কিন্তু গান গাওয়ার সময় হাতে সিগারেট কেন ।  এটা  অনেক বড় অন্যায় , এটা গান কে অপমান করা । আর আপনি কি জানেন না  সিগারেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ।এই বলে মেয়েটা আমার হাত  থেকে সিগারেট টা নিয়ে নিচে ফেলে দিয়ে হন হন করে হেঁটে চলে যায় ।
.
এর পরের দিন  থেকে আমি প্রতিদিন  সে দোকানের সামনে বসে বসে মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করতাম ।আমার বন্ধুরা ভাবছিলো
মেয়েটা সেদিন আমাকে অপমান করছিলো ।
এখন আমি সেই প্রতিশোধ নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছি ।   চার দিন পর সে দোকানের সামনে বসে বসে আবারো সিগারেট টানছিলাম । হঠাৎ আমার বন্ধুরা বলে দোস্ত ওই মেয়েটা আসতেছে । আমি তাড়াতাড়ি সিগারেটটা ফেলে দিলাম ।
তারপর তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম ।
  সে  আমাকে জিজ্ঞেস করে,
-  কিছু বলবেন ।
.
= তোমার নামটা কি জানতে পারি ।
.
- আমার নাম সুফিয়া   । এখন সামনে থেকে সরে  আমাকে যেতে দেন ।
.
- দেখো সুফিয়া তোমাকে আমার কিছু কথা বলার আছে ।  সেদিন সেই ঘটনা থেকেই আমি শুধু তোমাকেই নিয়ে ভাবছি । জীবনে যদি  এমন একটা মেয়ে  আসে যে মানুষ টা  ভালবাসবে আবার শাসন    করে  আমার জীবনটা গুছিয়ে দিবে  । তাহলে আমার  জীবনটা সার্থক হয়ে যাবে ।  তাই তোমাকে একটা কথা বলতে চাই ,  তুমি কি হবে আমার চিরদিনই ।
.
এরপর থেকেই তার সাথে আমার একটা রিলেশন হয়ে যায় । খুব ভালো যাচ্ছিল সেই  দিনগুলো । কিন্তু হঠাৎ করেই আমার বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন ।  আমি পরিবারের বড় ছেলে ছিলাম  ,তাই  পরিবারের সব দায়িত্ব আমার উপর পড়ে ‌।  আমাদের সংসারে নেমে আসে অভাব-অনটন । আমি কোন রকমে সংসার সামলাতে পারছিলাম না । তাই মা বাবা সিদ্ধান্ত নেন আমাকে বিদেশ পাঠাবেন । দেশে থেকে  আমি কিছুই করতে পারবো না ওনারা সেটা বুঝে গেছেন ।
তারপর কিছু জমি ছিল সেগুলো বিক্রি করে আমাকে বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করেন ।
.
একদিন সুফিয়ার সাথে দেখা করে ,সবকিছু জানালাম । তাকে বললাম আমাকে ভুলে যেতে । তার বাবা মায়ের পছন্দ করা কোন ছেলেকে বিয়ে করতে ।
সেদিন সুফিয়া অনেক কেঁদেছিলো । আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করছিল কেন আমি এমন করছি তার সাথে ।  আমি কি  কখনো তাকে  ভালবাসনি  , এতদিন কি তাহলে শুধু অভিনয় করছি।
.
কিন্তু আমি তার ভালোর জন্যই
তাকে আমি দূরে সরিয়ে দিয়েছিলাম । আমি জানতাম আমার সাথে থাকলে সে কখনো সুখী হতে পারবে না । এই অভাব অনটনে তাকে আমি রাজকুমারীর মত রাখতে পারব না ।
ভালোবাসা আর আবেগ দিয়ে জীবন চলে না বাস্তবতা বুঝতে হয় ।   আমি চেয়েছিলাম সে যেন অন্য কোন ছেলেকে বিয়ে করে সুখে সংসার করতে পারে যেন রাজকুমারীর মত থাকতে পারে ।  
.
সেই দিন ছিল তার সাথে আমার শেষ দেখা ।
সেদিন সুফিয়া অনেক কান্না করছিলো । তার অনেক কষ্ট হচ্ছিলো । কিন্তু আমার যে কষ্ট হয়নি তা কিন্তু নয়। তার দ্বিগুন কষ্ট আমার হচ্ছিল যখন আমি কথাগুলো বলছিলাম । আমারও বুক ফেটে কাঁন্না আসছিল  ।কিন্তু আমি অনেক কষ্টে কান্না চেপে রাখলাম  । তার সামনে নিজেকে দুর্বল হতে দিলাম না ।
এরপরে আমি বিদেশ পাড়ি জমালাম ।
-------
বিদেশ যাওয়ার পর থেকে  এখন আর আমাদের সংসারে অভাব-অনটন নেই ।  আমার উপর যে  দায়িত্ব ছিল আমি সবকিছু সুন্দরভাবে পালন করতে পেরেছি ।  একটা ঘর করলাম বাবার চিকিৎসা করালাম ।দুটো বোন ছিল তাদের বিয়ে দিলাম । তারপর ছয় বছর পর এখন আমি দেশে আসলাম । আজকে  আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে আসলাম ।  কিন্তু পথে সুফিয়ার  সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে তা আমি কখনো কল্পনা করিনি ।
.
আমি আমার বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারলাম । আমি বিদেশে যাওয়ার এক বছর পর সুফিয়ার বিয়ে হয়ে যায় একটা ছেলের সাথে । কিন্তু বিয়ের দুই বছর পর তার স্বামী মারা যায়  । এরপর সে তার বাপের বাড়ি চলে আসে এবং তার বাপ মায়ের সাথেই থাকে এখন ।
.
আমি সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না ,
আমার কানে শুধু সুফিয়ার  একটা কথাই বারবার ভেসে আসছে , উনি  সেই লোক মা,
  যে লোকটা আমার বুকের বাঁ পাশে  তোমার সাথে বাস করে।
.
আমি বাসায় এসে মাকে সবকিছু জানালাম ।
মা শুধু আমাকে বলল - যদি তাকে সত্যি ভালবাসো , তাহলে তাকে কখনো কষ্ট দিও না ।
ভালোবাসার মানুষকে কখনো কষ্ট দিতে নেই ।

------

মা বাবাকে নিয়ে যখন সুফিয়া  দের বাসায় গেলাম। তখন তার মা বাবার রাজি না হয়ে  নিষেধ করার কোন অবকাশ ছিলোনা । কারণ সুফিয়া এখন তাদের কাছে বোঝা । সেই বোঝা  যেভাবেই পারুক বিদায় করা চাই ।
কিন্তু বাধা দিয়েছিল সুফিয়া নিজে ,
সে আমাকে তার রুমে ডেকে অদ্ভুত শীতল কণ্ঠে বলল - কারো করুনা জিনিষটা আমার একদম পছন্দ না , আমি আশা করব তুমি বুঝতে পারছ।
আমি তখন কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না ।
শুধু বলছিলাম - আমি কারো উপর কখনো করুণা দেখাই না । আমি একবার ভুল করে আমার ভালোবাসাকে হারিয়ে ফেলেছি ।
দ্বিতীয় বার আর হারাতে চাই না ।তুমি সেদিন বলছিলে না তোমার বুকের বাঁ পাশে আমি বাস করি ।  ঠিক তেমনি আমার বুকের বাঁ পাশে তুমি বাস কর । আমি আজও তোমাকে ভালোবাসি ।
--------
এখন আমার ঘুম ভাঙ্গে , আমার প্রথম ভালোবাসার মানুষ সুফিয়ার রিনিঝিনি চুড়ির
শব্দে ।  ছয় বছর আগে যেমন করে আমাকে শাসন করতো  ,এখন ঠিক সেভাবেই শাসন করছে আমাকে ।  যখন  মেয়েটা আব্বু  বলে চিৎকার করে  আমার বুকে ঝাপিয়ে পড়ে । আমার মনে হয় , আমি পৃথিবীর অন্যতম সৌভাগ্যবান পুরুষ ।

--
লিখেছেনঃ মুহাম্মদ জাভেদ।


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 Comments: