গল্প নং: (২২)
নামঃ এক কাপ চা।
-
'ভাই সাহেব, আমি চা খাই না।'
রফিক সাহেব এ কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন,
- বলেন কী! সিলেটি মানুষ হয়ে চা খান না, এটা কি ভালো শোনায়? খেয়ে নিন, একদিন খেলে কিছু হবে না। আরে ভাই, এটাতো মদ না, যে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা আছে। এখানকার মানুষ প্রতিদিনই চায়ের মতো মদ খায়, কি খায় না?
'জ্বি খায়।'
- এবার বুঝুন।
'না মানে, আমি প্রায় ১৫ বছর হলো চা খাই না।'
পাশে চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রফিক সাহেবের বড় মেয়ে। অনেক মিষ্টি চেহারা। কে জানে, হয়তো নাম মিষ্টি, নয়তো আদুরী টাইপের কিছু একটা হবে। মেয়েটার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিতে নিতে বললাম,
'মামণি, নাম কী তোমার?'
- আরমা।
'বাহ, বেশ সুন্দর নাম।'
৬/৭ বছরের একটা মেয়ে হাতে কাপ-পিরিচ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এটা দেখে নিজেকে অনেকটা অপ্রকৃতস্থ মনে হলো। তখন মেয়েটা বলল,
- আঙ্কেল, চা'টা খেয়ে নিন, নইলে আম্মু মাইন্ড করবে।
রফিক সাহেবও বললেন,
- খেয়ে নিন রহমান সাহেব, যেহেতু আমার মামণি আপনাকে এতো করে বলছে। আর ১৫ বছর ধরে চা না খাওয়ার কী এমন বিশেষ কারণ, তা না হয় চায়ের কাপে একটু একটু চুমুক দিয়ে বলুন। মনে হচ্ছে ইন্টারেস্টিং ঘটনা ! কী, বলবেন তো?
.
অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। তখন রফিক সাহেব বললেন,
- যাও মামণি, তোমার আম্মুকে বলো একটু আসতে। গিয়ে বলবে আমাদের রেস্টুরেন্টের নতুন শেফ এসেছেন।
আমি চায়েতে চুমুক দিতে লাগলাম, আর ভাবলাম, 'আমি কি আছমার শেষ স্মৃতিটুকুও বিসর্জন দেবো? না না, তা হয় না! তবে কি আমার ভালোবাসার স্থায়িত্ব কমতে শুরু করেছে? নাকি আমি ভুলে যাচ্ছি?'
.
রফিক সাহেব দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য শুকনো কাঁসি দিলেন,
- কী এতো চিন্তা করছেন! খান তো, এটা তো আর বিষ না! তাছাড়া আমার বউ বিষ রাঁধতে জানে না, হাহাহা।
.
রফিক সাহেবের চমৎকার একটা গুণ হলো, অনেক হাসতে পারেন। অনেক সুখী হলে মানুষ হয়তো এমন করে হাসতে পারে।
আমি চা'তে চুমুক দিতেই ফিরে গেলাম আজ থেকে ১৫ বছর আগে। যেদিন আছমাদের বাড়িতে প্রথম গিয়েছিলাম ওর কাছ থেকে বিদায় নিতে। সে নিজের হাতে এক কাপ চা বানিয়ে দিয়েছিল। আমি অনেক সময় নিয়ে চা'টা খেয়েছিলাম। বন্ধুরা অনেক হাসাহাসি করছিল। তখন মনে হয়েছিল, 'এই কাপটা যদি একটা সাগর হতো, তাহলে সারাজীবন এই চায়ের কাপে একটানা চুমুকের পর চুমুক দিতেই থাকতাম। চৈত্রের গরমে মাঝেমধ্যে চায়ের কাপে গোসলও করতাম। আর নিঝুম সন্ধ্যায় নির্জন বারান্দায় বসে অপলক দৃষ্টিতে তাকে চেয়ে চেয়ে দেখতাম। অনন্তকালেও তৃষ্ণা মিটতো না।'
তখনো জানতাম না তার হাতের তৈরি চায়ের তৃষ্ণাটা এতোটাই প্রকট হবে। কোথাও গেলেও চা খেতাম না। কেন জানি মনে হতো আছমার মতো কখনো হবে না। মনে হতো তার হাতের চা ছাড়া অন্য হাতের চা খাওয়া আর গরম পানি খাওয়া একই কথা! সেদিন বিদায় নেবার সময় সে বলেছিল,
- আবার এসো।
আমার আর ফিরা হলো না। দশ বছর আগে আছমার বিয়ে হয়েছে। আমি তখন ইংল্যান্ডে অবৈধ অভিবাসী ছিলাম। তাকে পাবার জন্য সাধ্যমতো সব চেষ্টাই করেছি, কিন্তু পাইনি। না পাওয়ার প্রধান কারণ ছিল, 'আমি অবৈধ, আমি তখনো বৈধ হইনি। তাছাড়া আমরা ছিলাম সমবয়সী। এ ধরণের সম্পর্ক নাকি সুখের হয় না। আমার মা বাবারও তেমন একটা মত ছিল না, তবে একমাত্র ছেলের জন্য তারা কম চেষ্টাও করেন নি।'
.
রফিক সাহেব হঠাৎ আমার গা স্পর্শ করলেন,
- কী রহমান ভাই, আমার বউয়ের হাতের চা খেয়ে কি ফিদাহ হয়ে গেলেন?
'না ভাই সাহেব, ভাবীর হাতের চা খেয়ে ১৫ বছর আগের কথা মনে পড়ে গেলো। মনে হচ্ছে একটু আগে আমি তার হাতের চা খেয়েছি। এখনো জ্বিহবায় লেগে আছে। এ-ও কি সম্ভব! হতে পারে অনেকদিন পরে চা খেয়েছি, তাই বলে এতো মিল!
- কার হাতের কথা বলছেন? নিশ্চয়ই আপনার ইয়ের, হাহাহা। থাক আর বলা লাগবে না। আপনি এতোদিন পর চা খেয়েছেন, তাতেই আমি খুশি। আর হ্যাঁ, আমার ওয়াইফ আপনাকে সালাম দিয়েছেন, শুনতে পেয়েছেন তো?
'না, কই, শুনিনি তো। উনাকে আবার ডাক দিন না প্লিজ!'
- সে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলতে পারেন, সে আবার পর পুরুষের সামনে আসে না, নিজ পুরুষ ছাড়া, হাহাহা।
আমি তখন একটু লজ্জিত হয়ে বললাম,
'ভাবি, ক্ষমা করবেন। আমি আপনার সালাম শুনতে পাইনি। শুনবোই'বা কী করে! আপনার হাতে জাদু আছে। আপনার এক কাপ চায়ের জাদুতে আমি ১৫ বছর পূর্বে চলে গিয়েছিলাম। কিছু মনে যদি না করেন, আমাকে আরেক কাপ চা দিন না ভাবি। পুরনো স্মৃতিকে আরেকটু চাঙ্গা করে নিই।
- আপনি বসুন, আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
.
রফিক সাহেব বললেন,
- কী শেফ সাহেব, আপনি দেখি আমার বউয়ের চায়ের প্রেমে পড়ে গেছেন! হাহাহা। তবে আরেক দিন আপনাকে ডিনারের দাওয়াত দেবো। ওর হাতে সত্যি জাদু আছে। আহ, কী রান্না! আমার ভুরি দেখেই বুঝেন না, হাহাহা।
.
আরমা মামনি চা'টা আবারো নিয়ে আসলো,
- আঙ্কেল, চা।
তাড়াহুড়ো করে চা'টা হাতে নিলাম, যেন অমৃত কিছু পান করার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছি। চুমুক দিতেই কেমন জানি গরম পানির ভ্যাপসা গন্ধ নাকে লাগল। চা'টা রেখে দিলাম। পলকেই পানসে হয়ে গেলো কিছুক্ষণ আগের কিংবা ১৫ বছর আগের জিহ্বার স্বাদ।
.
রফিক সাহেব বললেন,
- রহমান ভাই, চা খাবেন না?
'না ভাই সাহেব, কেমন জানি অস্থির অস্থির লাগছে।'
- তাইলে থাক। যখন ইচ্ছে হয়, আপনি বাসায় এসে চা খেয়ে যাবেন। ছুটির দিন অবশ্যই আসবেন। আপনার জন্য আমার দরজা সবসময় খোলা।
আমি সোফা থেকে ওঠে দাঁড়ালাম, রফিক সাহেবকে বললাম,
'এবার উঠি, ভাবিকে যদি একটু ডাক দিতেন।'
.
একটা মাঝবয়েসী নারীর ছায়া দরজার আড়ালে লক্ষ্য করলাম। যথারীতি আন্তরিকতার সাথে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম,
'ভাবি, অশেষ ধন্যবাদ, এতো সুন্দর করে চা বানিয়ে খাওয়ানোর জন্য। সামান্য এককাপ চা ও যে অনেক পুরনো কথা মনে করিয়ে দেয়, তা আজই প্রথম বুঝলাম, যদি না আপনার হাতের এককাপ চা না খেতাম। তবে সত্যি বলতে কী, আবদারের চা'টা খুব একটা ভালো হয়নি, কিন্তু প্রথমটা আমার আজীবন মনে থাকবে, ঠিক পনেরো বছর আগের এককাপ চায়ে'র মতো।
.
আড়াল থেকে রফিক সাহেবের স্ত্রী বললেন,
- শেষের চা'টা আমি বানাই নি! আমার ননদ বানিয়েছে। আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম।
রফিক সাহেব হেসে ওঠলেন,
- একেই বলে শেফ! কোনটা কার হাতের চা, চুমুকেই পরিচয়, হাহাহা।
আমি আস্তে করে নীচু গলায় বললাম,
'আজকের মতো আসি।'
আমি জানি, আমার আর কোনোদিন আসা হবে না। এ-ও জানি, রফিক সাহেবের ওয়াইফ এখন কী বলবেন। দরজা ফাঁক করে যখন বেরিয়ে আসছিলাম, তখন পিছন থেকে মাঝবয়েসী একটা ছায়ার অস্পষ্ট কন্ঠস্বর ভেসে ওঠল,
- আবার আসবেন।
.
০৭.০৩.২০১৭
ন্যাপলি, ইতালি
.
লিখেছেনঃ রুবজ এ রহমান।
Author: Jahid
Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.



0 Comments: