অপেক্ষা

গল্প নং: (২১)
নামঃ অপেক্ষা।
-
অর্পা তার ডায়েরি নিয়ে বসেছে। শেষবারের মত আজ কিছু না লিখলেই নয়। আজকের পর এই ডায়েরিতে আর কিছু লেখা হবে না। চিরদিনের মত এটার স্থান হবে লকারে। চাবিটা ফেলে দেওয়া হবে বাড়ির পাশের ডোবায়। ডায়েরি খুলতেই একটা চিরকুট পড়ে গেল মেঝেতে। যেখানে ছোট্ট করে লেখা,'অপেক্ষায় থেকো, আমি আসব।'
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অর্পা। সে কলমের আঁচড়ে ভরে ফেলছে ডায়েরির পাতা।
.
-- কবিতা শুনবে অর্পা?
-- না, শুনব না। পড়াশোনা শেষ, আর কতদিন বসে থাকবে? কিছু একটা করো প্লিজ!
-- চেষ্টা তো করছি
-- কী চেষ্টা করছ! সারাদিন তো শুধু কবিতার বই নিয়ে বসে থাকো। কবিতা গিললে পেট ভরবে না রূপম। আমি বলছি না তুমি বড় চাকরি করো, ছোট-খাটো কিছু একটা করো। আমি অন্তত বাবা-মাকে বলতে পারি তুমি বেকার নও। কোনো বাবা-মা ই চায় না বেকার ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে।
-- আমাকে সময় দাও। মাত্র তিনটা বছর।
-- ঠিক আছে।
রূপম একটা চিরকুটে লিখে দিল, অপেক্ষায় থেকো আমি আসব।
-- আমি অপেক্ষায় থাকব।
.
তারপর আর রূপমের কোন খোঁজ নেই। কোথায় থাকে, কী করে কিছুই অর্পা জানে না। নাম্বারটাও বন্ধ। সিম পাল্টে ফেলেছে হয়ত। অন্তত একটা চিঠি তো দিতে পারে!
.
এক তিনের জায়গা দুই তিন পেরিয়ে আরও এক যোগ হয়েছে। সাতটা বছর ধরে অর্পা শুধু অপেক্ষাই করে গেল। রূপম আর ফিরে আসেনি।
"আমি আমার কথা রেখেছি রূপম। তিন বছর অপেক্ষা করতে বলেছিলে, আমি সাত বছর ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। চেনা পথটা কি তুমি ভুলে গেছো? নাকি কবিতা প্রেমীরা এমনই হয়? কবির ঔদাস্য কি কবিতা প্রেমীর ওপর প্রভাব ফেলে? আর সেই প্রভাবে তোমরা বাঁধন ছেড়ে পালাতে চাও সর্বদা! তোমরা শুধু নিজেদের কথাই ভাবো, আমার মত অপেক্ষায় থাকা অর্পাদের কথা একবার মনে পড়ে না?"....." কারো পায়ের শব্দ শুনে অর্পা ডায়েরি বন্ধ করল।
অর্পার বড়বোন ঘরে এলো।
--  দু বার তোকে ডেকে গেল মা আর তুই এখনও ঘরে বসে?
-- তুমি যাও আপু আমি আসছি।
-- দুই মিনিট সময় দিলাম। তাড়াতাড়ি আয়।
.
অর্পা ডায়েরিটা লকারে রেখে দিল। সাত বছরের কষ্টগুলো বন্দি থাকুক ওখানে। বন্দি থাকুক রূপমের যত স্মৃতি। অর্পা চাবিটা জানালা দিয়ে ফেলে দিল ডোবায়।
.
আয়নায় সামনে বসে আছে অর্পা। আজ তার বিয়ে। পার্লার থেকে সাজাতে দুজন মেয়ে এসেছে। তারাই কনের সাজে সাজিয়ে দিচ্ছে অর্পাকে। নতুন সম্পর্কে বাঁধা পড়বে শুভ্রর সাথে। কিছুক্ষণের মধ্যে শুভ্র বরের বেশে চলে আসবে।
.
আচ্ছা, আজ যদি রূপম ফিরে আসে? কী করবে সে? সাত বছরের অপেক্ষা সামনে এসে দাঁড়ালে অনুভূতি ঠিক কেমন হবে ভাবতেই অর্পা শিউরে উঠল। টুং করে মেসেজ এলো অর্পার ফোনে। সকাল থেকেই শুভ্র একের পর এক মেসেজ করছে। মেসেজ আসার টুং টাং শব্দটা খারাপ না, ভালোই লাগছে। পুরাতন ব্যথারা নতুন করে উঁকি দিতে দিতে হারিয়ে যাচ্ছে। অর্পা ফোন দেখতে উদ্যত হতেই পার্লার থেকে আসা একজন মেয়ে বলল,"ম্যাম এখন চোখ খুলবেন না। একটু অপেক্ষা করুন প্লিজ!"
.
অর্পা নিজের ঘরে বসে আছে। সাজানো শেষ হয়ে গেছে। বরযাত্রীরাও চলে এসেছে। অর্পাকে একা রেখে সবাই বর দেখতে চলে গেছে। শুভ্র এখনও একটার পর একটা মেসেজ করছে। টুং করে শব্দ হতেই অর্পা মেসেজ অন করল। হাত কেঁপে উঠলো অর্পার। রূপম! রূপম মেসেজ করেছে! কী উত্তর দেবে সে মেসেজের!
.
দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ শুনে অর্পা চমকে উঠল। "দরজা খোলা আছে।" অর্পা বলল। অর্পা বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। রূপম সামনে দাঁড়িয়ে, অর্পার সাত বছরের অপেক্ষা।
.
অর্পার ইচ্ছে করল রূপমকে ছুঁয়ে দেখতে। চোখের সামনে যা দেখছে তা বাস্তব নাকি কল্পনা! "রূপম! তুমি সত্যিই এসেছো?" অর্পা  অবিশ্বাসের সুরে বলল।
রূপম অর্পার হাত ধরে বলল,"আমি সত্যি এসেছি অর্পা। কথা দিয়ে ছিলাম তো আমি আসব।"
-- আজ আমার বিয়ে রূপম! এত দেরিতে কেনো এলে তুমি? কেনো?
-- তোমাকে সব বলব। তার আগে এই বিয়ে বন্ধ করতে হবে। আমি তোমাকে খুব ভালবাসি অর্পা। তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারো না!
.
-- কীভাবে বন্ধ হবে বিয়ে! এখন আর সম্ভব নয়।
-- সম্ভব, আমি সবাইকে বুঝিয়ে বলব।
-- বোঝানোর কোন প্রয়োজন নেই রূপম।
-- কেন অর্পা? তুমি আমাকে চাও না! ভালোবাসো না?
-- চাইতাম, ভালোও বাসতাম।
রূপম অর্পার হাত ছেড়ে দিয়ে বলল,"ওহ! তারমানে এখন আর ভালোবাসো না! হবু বর কয়েকদিনেই মন ভুলিয়ে দিলো?"
.
অর্পা শব্দ করে হেসে উঠল। হাসিতে যে কতটা বিদ্রুপ মেশানো তা রূপমের বুঝতে অসুবিধা হল না। অর্পা হাসি থামিয়ে বলল,
"রূপম এই বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে! আমার বিয়ে! বাড়ি ভর্তি মানুষজন দেখেছো? বরযাত্রী এসে পড়েছে, বরের আসনে শুভ্র আমার জন্য অপেক্ষা করছে। তোমার জন্য সাত বছর আমি অপেক্ষা করেছি। তুমি তো আসনি! আমার বাবা-মাকে আমি কিছুই দিতে পারিনি। আজ তাদের পছন্দমত একটা কাজ করতে যাচ্ছি। তারা কত খুশি তুমি জানো! প্রতীক্ষিত ভালোবাসার জন্য আমি তাদের খুশি কেড়ে নিতে পারব না, আমার কাছে তাদের সম্মান তোমার ভালোবাসার চাইতেও বড়। সুতরাং, তুমি এখন আসতে পারো।"
.
কিছু একটা বলতে গিয়ে রূপমের গলাটা ধরে এলো। নিঃশব্দে ফেরার পথে পা বাড়াল সে। অর্পা এখন আর তার নেই। নিজের খাম-খেয়ালিপনার জন্যই আজ খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। অর্পা আজ থেকে শুভ্রর, শুধুই শুভ্রর। অথচ একদিন অর্পা শুধু রূপমেরই ছিল।

.
লিখেছেনঃ  সুলতানা সাবিহা।


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 Comments: