গল্প নং: (২০)
নামঃ আমার বাবা।
-
সেই ক্লাস টু তে পড়া অবস্থায় অংকে গড়মিল করতাম বলে আব্বু এমন এমন থাপ্পরগুলো দিতেন,
.
মনে হতো আমার কান থেকে এমন এক গরম শিখা বেরুচ্ছে, সেখানে রুটি গরম করা যাবে। মিনিট পাঁচেক তো কানে স্টিমারের হরণ বাজতো একটানা। শোঁ শোঁ।
.
সেই থেকেই আব্বুকে ভয় পেতাম। ভয় পেতাম বললে ভুল হবে, প্রচুর ভয় পেতাম। আব্বুর প্রতি একরকম অভিমান বিরাজ করতো। আর সেটা সেই শৈশব থেকেই বর্তমানে অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।
.
আব্বু বাসায় প্রবেশ করার সাথে সাথেই এখনো কেমন একটা বিব্রত হই। কোনো একটা বাহানার ছলে বাসা থেকে বের হয়ে যাই।
.
বয়স ১৯-২০ চলছে বর্তমানে। হিসেব মিলিয়ে বলতে পারবোনা এ ২০ বছরে ২০ বারও আব্বুর সাথে খেতে বসেছি কিনা ।
.
একবার রোজার মাসে ইফতারির টেবিলে আজানের অপেক্ষায় আছি এমন সময়ে কোনো এক কারনে স্বজোরে একটা থাপ্পর দিয়েছিলেন।
.
সেই থেকে যখনি শুনি আব্বু সহ খেতে বসবেন, অমনি কোনো বাহানায় সেখান থেকে সরে যাই। পরে এসে একলা খাবার খাই। বাই-চান্স যদিও একসাথে খেতে হয়, তাহলে চোখ দুটো খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত ভাতের প্লেটের উপরেই থাকবে। আর প্রতি দু মুঠু খাওয়ার পরপরই পানি খেতে হবে, গলা শুকিয়ে যায় যে!
.
এটা কি সম্মান,ঘৃণা,অভিমান নাকি ভয় কিছুই বুঝিনা।
.
কোনো বাবাই তার ছেলের নামে কোনো রকমের প্রশংসা করতে খুব একটা শোনা যায়না।
.
কিন্তু তার পরেও বাবাদের প্রতি ছেলেদের আর ছেলেদের প্রতি বাবাদের আলাদা একটা টান থাকে। যেটা তারা উভয়েই কেউ কাউকে বুঝতে দেয়না সহজে।
.
অল্প কিছুদিন আগে বাবার সাথে এক লোক ঝগড়া বাধিয়েছিল। এক পর্যায়ে বাবাকে কটুক্তি করে কথা বলেছিল সে লোকটি। বিশ্বাস করেন পাশের লোকজন আমাকে না আঁটকালে হয়তো লোকটাকে ওখানেই পুঁতে ফেলতাম! এমন মানসিকতা কাজ করছিল তখন।
.
যে বাবা কখনো আমার কোনো প্রশংসা করেননি, আবার সেই বাবার মুখেই আমি প্রথম আকাশজয়ী খুশি অনুভব করেছিলাম যখন শুনলেন আমি প্রাইমারির পিএসসি পলিক্ষায় ভাল রেজাল্ট করেছি।
.
বাসায় কারো হাল্কা সর্দি হলেও ফার্মেসি হতে মেডিসিন নিয়ে বাবা হাজির। কিন্ত বাবার উপর এত অসুখ আসে-যায়, কখনো একটা প্যারাসিটেমলও খেতে দেখিনি।
.
আসলে বাবাদের বুঝা মুশকিল রে ভাই... বড়ই মুশকিল
.
আব্বুর সাথে প্রয়োজন ছাড়া ঠিকমতো কথাও হয়ে উঠেনা। এমন এমন সময়ও গেছে সপ্তাহে একটি বারও আব্বুর সাথে কথা হয়নি।
.
কেন যানি ছোটবেলা থেকেই বাবা থেকে অদৃশ্য একটা দূরত্ব নিয়ে বড় হই আমরা অধিকাংশ ছেলে। বয়সের সাথে সাথে দূরত্বটা বেড়েই চলেছে..
.
আসলে বাবার প্রতি এক প্রকার ইগো কাজ করে আমাদের মাঝে। তারপরেও; বাবা রাতে বাসায় ফিরতে দেরি হলে কিছুক্ষন পরপর আম্মুকে জিজ্ঞেস করি,
.
আব্বুকে কল দিয়েছেন কিনা?
কি বলছেন আব্বু? কখন আসবেন?
কোথায় এখন?
.
সারা বছর বসে থাকি, কবে দুই ঈদ আসবে আর কোলাকুলির উসিলায় উনাকে জড়িয়ে ধরতে পারব ক্ষনিকের জন্য।
.
এমনি এমনি যদি কোন দিন বলে ফেলি, “আব্বু একটু জড়িয়ে ধরি?” তখন আব্বু শিওর ভাববেন, হয়ত আমি পাগল হয়ে গেছি ... বা ... কোলাকুলির উসিলায় আমি উনার প্যান্টের পিছন থেকে মানি-ব্যাগ হাতিয়ে নিতে এসেছি!
.
আমার মতো, বাবাদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে না পারা ছুপা-ত্যাঁদড়দের জন্য,
.
- মূলত দুই ঈদই হলো "ফাদার্স ডে!"
.
ব্যাসিক্যালি প্রতিটা মানুষের জীবনে একটা স্বপ্ন থাকবেই। আর আমার সে স্বপ্নটা হচ্ছে -
.
একদিন অনেক বড় মানুষ হবো। তারপর আব্বুর নিজের স্বপ্ন সম্পর্কে জানবো, আর সে স্বপ্নটা পূরন করার অমলিন চেষ্টা করবো। আব্বু নামের মানুষটাকে দামি মার্সিডিজের ফ্রন্ট সিটে বসাতে না পারি, অন্তত বাইকের পিছনের সিটে বসিয়ে আচ্ছামতো বেড়াবো, দিগ দিগন্তে...
.
সর্বোপরি, জগতের প্রতিটা বাবা বেঁচে থাক, আজীবন বেঁচে থাক!♥
.
লিখেছেনঃ রায়হান।
Author: Jahid
Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.



0 Comments: