গল্প নং: (১৯)
নামঃ সায়েক বল্লার মুরগি প্রেম।
-
কোনো ফোনটোন না করে হঠাৎ কোত্থেকে রাত এগারোটার সময় সায়েক বল্লা আমার বাসায় এসে হাজির হলো। হাতে ছিল একটা দেশি মুরগি। কিছু বুঝে ওঠার আগে তাকে নিয়ে আমার মাথায় অনেক আবোলতাবোল প্রশ্ন জাগল। যেমন__
'বন্ধু আমার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, একদিনও সে তাহজ্জুতের নামাজ মিস করে না। বাবার ধন-দৌলতেরও কোন অভাব নেই। তবে বুঝলাম না, কেন সে রাত্রিবেলা মুরগি চুরির পেশা বেছে নিলো?'
.
আবার অন্যভাবে অন্যমাত্রার অন্যরকম ভাবনা মনে উদয় হলো__
'মানুষ কারো বাড়ি যেতে হলে মিষ্টি, জিলাপি, বিস্কুট, চানাচুর কিংবা ফলমূল অথবা ড্রিংক-জাতীয় কিছু হাতে করে নিয়ে যায়, কিন্তু সে দেখি মুরগি নিয়ে এসেছে! ঘটনা কী? মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেল নাকি?'
.
দরজা খুলতেই সায়েক বল্লা তার হাতের মুরগিটা আমার সোফার ওপরে ছুড়ে দিয়ে নায়কের মতো সে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আরবীয় স্টাইলে আমার গালে অনেকগুলো চুমোও খেল, যেন আমি তার নায়িকা। আমি একটু না, পুরোপুরি বিরক্ত হয়ে বললাম__
'যা বলার বলে ফেল। এত তৈল মালিশ করা আমি পছন্দ করি না। জানিস তো, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ।'
.
সে তখন খুবই আকুতিমিনতি ভঙ্গিমায় বলল__
'সেই ভক্তিটাই যে চোরের ভক্ষণ। আমার একটা উপকার করে দে না দোস্ত। এই উপকারের জন্য আল্লাহ্ তোকে বেহেশত নসিব করবে।'
.
আমি তখন মেজাজ গরম করে ধমক দিয়ে বললাম__
'ফাইজলামি করিস? কোন মতলবে এসেছিস তাড়াতাড়ি বল। কোনো তালবাহানা করছিস, তো মরছিস।'
.
তখন সে আমতা আমতা করে বলল__
'কাল তো কলেজ লাইফের শেষদিন। আর তুই তো জানিস, আমি লোপাকে কত ভালোবাসি। আজ পর্যন্ত তাকে এই কথা বলতে পারিনি। তার জন্য আমি জীবন দিয়ে দিতে পারি। সত্যি বলছি দোস্ত, তাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।'
.
আমার মেজাজ পুরাই খারাপ হয়ে গেল তার এই সব বস্তা পঁচা সস্তা ডায়লগ শুনে। আমি তাকে স্টেট ওয়ে বলে দিলাম__
'এইটা সিনামার শুটিং স্পট না যে আমাকে তুই ডায়লগ শুনাবি। কী করতে হবে সোজাসুজি বল? নইলে কেটে পড়।'
.
সে তখন মুরগিটাকে কোলে নিয়ে একটু আদর করতে করতে বলল__
'এই মুরগির রক্ত দিয়ে আমাকে একটা কাব্যিক প্রেমপত্র লিখে দে না দোস্ত। যাতে সে প্রেমপত্র পড়ার আগেই রক্তমাখা পত্র দেখে আবেগ আপ্লুত হয়ে আমার প্রেমে পড়ে যায়।'
.
সায়েক বল্লার অভিনব মুরগি প্রেমের প্যাটার্নটা বেশ ভালো লাগল। নিজের প্রেস্টিজের কথা ভেবে লিখব না বলে তাকে প্রায়ই না করে দিয়েছিলাম। শেষে তার চোখের কোণে কয়েক ফোঁটা জল দেখে আর না করতে পারলাম না। দুই বন্ধু মিলে রাত বারোটায় মুরগির জীবনের শেষ বারোটা বাজিয়ে দিলাম।
আমি অনেক ভালো আর্ট করতে জানি বলেই সেই সুবাদে সায়েক বল্লা আজ আমার কাছে এসেছে। তা না হলে সে আমার কাছে কখনোই আসতো না। আরেকটা উদ্দশ্যে সে মাঝেমধ্যে আমার কাছে আসে, সেটা হলো লোপার সঙ্গে আমার খুব ভালো খাতির আছে বলেই সে তার খবরাখবর নিতে পারে খুব সহজে।
কী আর করার, বন্ধুর জন্য যদি কিছু করতে না পারি, তাহলে আমি কীসের বন্ধু? তাই তো রক্তের গন্ধ সহ্য করে বন্ধুর জন্য নাক কান মুখ সবি বেঁধে কাব্যিক ভঙ্গিমায় চিঠি লিখতে শুরু করলাম। মাঝেমধ্যে সেও শিখিয়ে দিলো দু-একটা প্রেম ঘটিত বাক্য। চিঠি লিখা শেষ করে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, তার পক্ষ থেকে আমি নিজেই প্রপোজাল করবো লোপাকে, তা যেভাবেই হোক। আর সে তখন আমার পাশাপাশি হাঁটবে কোনো কথা বলবে না, যা বলার আমি বলব।
.
কলেজের শেষদিন। সবার একটু-আধটু মন খারাপ। প্রচণ্ড গরম থাকায় চোখের পানির সঙ্গে কপালের ঘাম খুব সহজেই সবার একাকার হয়ে যাচ্ছে। লোপার মতো সায়েকেরও একই অবস্থা। আর আমি ঘেমে যাবার পাশাপাশি আমার ভিতরে ভিতরে ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। তার কারণ হলো, লোপা এই প্রপোজালকে ভালো চোখে নেয় কি না? কলেজের ক্যাম্পাসের স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলো এক-এক করে আমরা ঘুরে ঘুরে দেখতেছি। হঠাৎ লোপাকে বললাম__
'লোপা, একটা কথা বলব। রাগ করবি না তো।'
.
লোপা তখন অন্যরকম একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল__
'বল না? সমস্যা কী?'
.
আমি তখন সুযোগসন্ধানী ছেলের মতো যদি লাইগা যায়-- এই আদর্শ মনে প্রাণে অনুধাবন করে তাকে বললাম__
'I love you.'
.
সে তখন রেগেমেগে রোদছাতা অফ করে যখন মারমুখী ভঙ্গিমায় বলল__
'কী বললি শয়তান!'
.
ঠিক তখনই সায়েক বল্লা নিজের জান নিয়ে দিলো ঘোড়দৌড়। লোপা তখন এ ঘটনার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারল না। হতবাক হয়ে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল__
'সায়েক বল্লা দৌড়াচ্ছে কেন রে?'
.
আমি হাসতে হাসতে বললাম__
'কারণ, প্রপোজালটা ছিল তার। আমি জাস্ট তার পক্ষ থেকে তোকে পেস করেছিলাম। বোধহয় ভয় পাইছে, তাই ঘোড়ার মতো দৌড়াচ্ছে। অযথা তুই আমাকে ছাতা দিয়ে মারতে চাইলে গো সোনা।'
.
মূল ঘটনা বুঝতে পেরে সে তখন খিলখিল করে হাসতে লাগল। কেন জানি তার হাসিটা দেখে খুব মায়া হলো। ইচ্ছে হলো, তাকে খুব করে আরো হাসাই। তাই পকেট থেকে সায়েক বল্লার সেই মুরগি প্রেমপত্র বের করে তার হাতে ধরিয়ে দিলাম। সে তখন প্রেমপত্র হাতে নিয়ে সন্দেহ ভরা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল__
'কী এটা?'
.
আমি তখন তার দিকে রহস্য ভরা চোখে তাকিয়ে বললাম__
'দ্যাখ না পড়ে, কী এটা।'
.
অনেক মনোযোগ দিয়ে সে পড়তে লাগল। তার দু চোখ বেয়ে দু ফোঁটা চোখের জল মুরগি প্রেমপত্রে পড়ে অম্লান হয়ে গেল। প্রেমপত্র পড়া শেষ করতে না করতেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম__
'বিশ্বাস কর, এই গুলি আমি মুরগির রক্ত দিয়ে লিখেছি, আমার রক্ত দিয়ে লিখিনি।'
.
সে তখন আমার নাসিকা চেপে ধরে আহ্লাদের সহিত বলল__
'মিথ্যুক, তুই আমাকে অনেক ভালোবাসিস, আমি জেনে গেছি। আর মিথ্যে বলিস না। আমি জানি তুই তোর হাত কেটে লিখেছিস।'
.
আমি বড্ড বেশি সুযোগসন্ধানী ছেলে কিনা। তাই আর এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলাম না। যেহেতু মেঘ না চাইতে বৃষ্টি পেলাম, সেহেতু আমিও তাকে খুব করে জড়িয়ে ধরে বললাম__
'আসলে হাত কেটে নয় লোপা, আমার বুকের বাম পাশের পাঁজর কেটে তার রক্ত দিয়ে লিখেছি।'
.
সে তখন আমার বুকের বাম পাশে মুখটি গুঁজে বলল__
'তোর ক্ষতবিক্ষত বুকে আমি এখন মাথা রাখতে চাই। একটু হাত বুলিয়ে দিবি?'
.
আমি তখন তার মাথায় ডান হাত বোলাতে লাগলাম আর দূর থেকে সায়েক বল্লার উঁকিঝুঁকি অবলোকন করেই গেলাম। আহা রে, সায়েক বল্লার জন্য বড়ই আফসোস হচ্ছে।
.
২৫.১০.২০১৪
হাসপে, জার্মানি
.
রম্যগল্পগ্রন্থ : কু- সুমাচার (২০১৫)
-
লিখেছেনঃ রুবজ এ রহমান।
Author: Jahid
Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.



0 Comments: