গল্প নং: (১৮)
নামঃ ভুল।
-
ক্যাপসুল মার্কেটে ওজন মাপতে গিয়ে মেয়েটাকে দেখেছিলাম, বেশ হাসিখুশি আর উজ্জ্বল মুখশ্রীর তরুণী রূপে । উচ্চতা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি হিসেবে ৫৬ কেজি ওজন ঠিকই ছিলো কিন্তু সে বেকে বসলো । তার কথা হলো, দুইমাস আগেও সে ৫২ কেজি ছিল । হঠাৎ করে এত বেড়ে যাওয়ার মানে কি ? নিশ্চয়ই মেশিনে গোলমাল আছে । কিন্তু মেশিনের মালিক তার কথা মানতে নারাজ । মেয়েটাকে বুঝাতে লাগলো, "এটা জাপান মেইড । এই মেশিন ভুল ওজন দেখায় না । এতে হাই টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে ।"
.
ওজন মাপার মেশিনে উন্নত প্রযুক্তির কি ব্যবহার করা হতে পারে তা আমি বুঝে ওঠতেই পারিনি । দোকানীর সাথে অনেকক্ষণ তর্ক করার পরেও যখন মেয়েটা মানলো না, তখন আরেকটা যন্ত্র এনে তার ওজন পরীক্ষা করা হলো । কিন্তু ওজনের কোন হের ফের হলো না । সেই ৫৬ কেজি ৪০০ গ্রাম !!
.
ঘটনায় লজ্জিত হয়ে মেয়েটা দাত দিয়ে জিভ কাটলো আর স্যরি বলে চলে গেলো । ওজন মাপা বাদ দিয়েই মেয়েটার পিছু পিছু ছুটলাম আমি । সারা মার্কেট ঘুরে ঘুরে মেয়েটা নোস পিন, কিছু মেয়েলী জিনিস আর Jack & Jones এর একটা টি-শার্ট কিনলো । যেহেতু, তার সাথে সাথে ঘুরছিলাম তাই আমিও একটা পোলো শার্ট কিনে নিলাম । রাস্তায় বেরিয়ে মেয়েটাকে আর খুজে পেলাম না । হাটতে হাটতে মিষ্টি পট্টির সামনে আসতেই দেখি সেই মেয়েটা জিলাপি কিনছে ।
.
রিকশা নিয়ে মেয়েটার বাসা পর্যন্ত ফলো করলাম । তারপর তার পিছু পিছু সব জায়গায় । পার্কে গেলে আমিও পার্কে, মার্কেটে গেলে আমিও মার্কেটে । আর সেই দিন তো তার পিছু পিছু লেডিস টয়লেটেই চলে যাচ্ছিলাম ! ভাগ্যিস এক মহিলা ধ্যান ভেঙে দিয়েছিল । নইলে তো ওইদিন আমার কপালে দুঃখ ছিল । প্রায় আধামাস ধরে ঘুরছি মেয়েটার পিছু পিছু । কিন্তু, তার সাথে কথা বলারই সাহস হচ্ছে না । মেয়েটাও কেমন যেন ! প্রতিদিন তার পিছু পিছু ঘুরি, কখনো একটু ডাকও দেয় না !! সে তার মতোই হেটে চলে । যেন সে জিদ ধরেছে, আমি কিছু না বলা পর্যন্ত সেও বলবে না !!
.
হঠাৎ একদিন আমার ধারণাকে মিথ্যা করে দিয়ে সে ডাকলো । কথা হলো । কফি হাউসে বসলাম । কফি খেতে খেতে ফেইসবুক আইডি নেওয়া হলো । তারপর চ্যাটিং, ফোনালাপ হতে হতে প্রেমটা যে কখন হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না । আমি কখনো তাকে প্রপোজ করি নাই । আমি আমাদের রিলেশনের নাম দিয়েছিলাম, "আন অফিসিয়াল রিলেশন !!" অবশ্য এই নামটা শুনলেই সে ক্ষেপে যেতো আর খুব মন খারাপ করতো । আমি তখনো অনার্সে পড়ি, শেষ বর্ষে । কিন্তু তার পড়াশোনা শেষ আরো একটা বছর আগেই । বাংলায় অনার্স কমপ্লিট করে বসে আছে ।
.
মিরার বাসাটা দোতলা । নিচ তলায় তালা দেওয়া থাকে । কোন ভাড়াটিয়া নাই । দোতলায় দুইটা বেডরুম, একটা রুমের সাথে অ্যাটাচড বাথরুম আর একটা বাইরে আর রান্নাঘর নিয়ে খুব বেশি বড় জায়গা না । আমি দুইবার গিয়েছি এ পর্যন্ত । খারাপ কিছু করার মত ছেলে আমি না । চাইলেই প্রেমের দোহাই দিয়ে অনেক কিছু করতে পারতাম । কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, বিয়ের আগে কিছু করবো না ।
.
রাতের বেলা তার ফোন সবসময় বন্ধ থাকতো । এটা সে রিলেশন শুরুর দিকেই আমাকে খুব ভালোভাবে বুঝিয়ে বলে দিয়েছিল । রাতে ফোন বন্ধ করে রাখে । বিষয়টা আশ্চর্যের হলেও এটাই সত্যি যে, ওর সাথে আমার রাতের বেলা কখনো কথা হয়নি । রাতের বেলা কি করতো সেটা জানতে চাইলে বলতো, আমি তোমাকে সব বলবো । একটু সময় দাও । তাই আমিও আর কখনো জোর করিনি । বলতো, রিলেশন টিকে থাকে বিশ্বাসের ওপরে ভিত্তি করে । আমিও খুব বিশ্বাস করতাম তাকে । প্রয়োজনের চেয়ে বেশি যার মানে হলো অন্ধ বিশ্বাস করতাম বলেই আমাকে পচতাতে হয়েছিল ।
.
সেদিন রাতে বাবার সাথে রাগারাগি করে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম । ঠান্ডায় খুব কাপাকাপি করছিলাম । চায়ের দোকানে চায়ের কাপ হাতে চুলার পাশে বসেছিলাম । কিন্তু দোকান বন্ধ করাতে আমারও বের হতে হলো । শীতের হাত থেকে বাচতে আমার একটা আশ্রয় দরকার ছিল । ঠিক করলাম, আজকে রাতটা ওর বাসাতেই কাটাবো । বাসায় তো ও ছাড়া আর কেউ থাকেও না তাই সমস্যা হবে না । আর, আমার কোন বাজে উদ্দেশ্য ও তো ছিল না । গেট আটকানো ছিল তাই দেয়াল টপকে ভিতরে ঢুকলাম । কেচিগেট খোলা ছিল তাই সিড়ি বেয়ে দোতলায় চলে গেলাম ।
.
দরজায় বাইরে দাড়িয়ে শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম । সেই শব্দ শুনতে শুনতে আমার কান লাল আর গরম হয়ে গেলো । বেশিক্ষণ শুনতে পারলাম না । কান চেপে ওখানেই বসে পড়লাম, আর আমার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো । আধাঘন্টা মতো বসে ছিলাম হয়তো । শীত আর গায়ে লাগছিলো না । আমি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম !! হঠাৎ দরজা খুলে মধ্য বয়স্ক লোক বেরুলো আর তার সাথে মিরাও । আমাকে দেখে সেও ভীষণ চমকে গেল । লোকটা চলে গেলে ও আমাকে টেনে ভিতরে নিয়ে গেলো ।
.
শুরু হলো সেই টিপিক্যাল কাহিনী । শহরে পড়াশোনা করতে আসা, অপহৃত হয়ে সতীত্ব হারানো, বাসায় জানাতেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন । ভদ্র সমাজে মুখ না দেখাতে পেরে এভাবে জীবন কাটানো । তারপর দেহ ব্যবসায় ঢুবে যাওয়া ।
.
আমি চেয়ারে বসে ছিলাম । অনেক কিছুই বলতে চাচ্ছিলাম কিন্তু আমার মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছিল না । অনেকক্ষণ ওভাবেই বসে থাকার পর বললো, "আমি তোমাকে এই কথা অনেক আগেই বলে দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি । তোমাকে হারানোর ভয় ছিল ।"
.
আমি বাংলা সিনেমার নায়কদের মতো বা অন্যান্য গল্পের চরিত্রদের মতো তাকে আপন করে নিতে পারিনি । তার প্রতি ঘৃণা জন্মে গিয়েছিল । একে তো সে পতিতা ছিল, দ্বিতীয়ত সে আমাকে ধোকা দিয়েছিল । আমি তার সাথে আর কখনো দেখা করি নাই, অলৌকিক ভাবেও কখনো দেখা হয় নাই আমাদের । শহরের বিশালতা যতোটা ছিল না, মনের দূরত্ব তার চেয়ে বেশি ছিল । তাই হয়তো কখনো ভুলেও দেখা হয় নাই ।
.
ঐদিন তাকে ফেলে আসার সময় সে আমার পায়ে ধরেছিল কিন্তু আমার মন গলেনি । সে বলেছিল, "আমাকে একটা সুযোগ দাও । আমি ঠিক হয়ে যাবো তোমাকে পেলেই ।" কিন্তু আমি সুযোগ দিইনি । ঘৃণাভরে বলেছিলাম, "পতিতাদের কখনো বিয়ে হয় না ।"
.
ছেলেটা বায়না ধরেছে খেলনা কিনে দিতে হবে তাই মার্কেটে এসেছি ওকে নিয়ে । খেলনা দোকানে গিয়ে মিরার সঙ্গে দেখা । একটুও বদলায়নি এই দীর্ঘ পাঁচ বছরে । শুধু চোখের চশমাটা পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে । ছেড়া জামা পড়া এক মেয়েকে সাথে নিয়ে খেলনা নেড়েচেড়ে দেখছে । আমিই কথা বলতে এগিয়ে গেলাম ।
.
- কেমন আছো ?
- ভালো । আপনি কেমন আছেন ?
- ভালো ।
- এটা কি আপনার ছেলে ?
- হ্যা । রাইয়ান ।
- সেই নামটাই রেখেছেন ? একেবারে আপনার মতো হয়েছে দেখতে ।
- তোমার সাথে মেয়েটা কে ?
- ওর নাম রেণু । দুই কিলোমিটার দূরে যে নতুন বস্তিটা হয়েছে, ওখানে থাকে । আমাকে প্রতিদিন বলে খেলনা কিনে দিতে । তাই আজকে নিয়ে এলাম ।
.
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, "এখনো কি...??"
সে বুঝলো আমি কি বলতে যাচ্ছি ! তাই পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বলে ওঠলো, "নাহ !! আমি "ফিউচার এন্ড ড্রিমস" স্কুলে বাচ্চাদের পড়াই । ওইদিনের পরে থেকে আমি আর কখনো ওই কাজ করিনি ।"
.
- বিয়ে করেছো ?
- আপনি ভুলে গেছেন ?
- কি ভুলে গেছি ?
- আপনিই বলেছিলেন, পতিতাদের কখনো বিয়ে হয় না ।
- স্যরি । তখন মাথা ঠিক ছিল না ।
- কিন্তু কথা সত্য বলেছিলেন । যাই হোক । রাইয়ানের আম্মু ?
- সে এখন আমার সাথে থাকে না ।
- মানে ?
.
আমি মুচকি হেসে বললাম, "মানুষ চিনতে ভুল করেছিলাম আমি । সে অন্য কারো ছিল, অন্য কারোই হলো শেষ পর্যন্ত । রাইয়ান হওয়ার পরেই অন্য এক জনের হাত ধরে চলে গেছে ।"
.
ভেবেছিলাম আমার কথা শুনে মিরা খুব খুশি হবে । মনে মনে হয়তো বলবো, খুব ভালো হয়েছে । খুব খুশি হয়েছি আমি । কিন্তু খুশির কোন আভাই দেখলাম না ওর চোখে মুখে । আমার কথা শুনে একটা মলিন হাসি দিলো !! তারপর রেণু নামের সেই মেয়েটাকে সাথে নিয়ে বের হয়ে গেলো ।
.
রাইয়ানের জন্য একটা বড় বন্দুক আর রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি কিনে, মার্কেট থেকে বের হয়ে এলাম । আজকে হঠাৎ কেন যেন মনে হচ্ছে, পাঁচবছর আগে আমি একটা বড় ভুল করেছিলাম, যেটার শাস্তি এখন আমার ছেলেকে পেতে হচ্ছে !!
.
লিখেছেনঃ রুদ্র নীল।



0 Comments: