গল্প নং: (১৭)
নামঃ টিফিন বক্স।
-
রাত প্রায় ৮টার কাছাকাছি চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।
চারপাশ থেকে ঝিঝিপোকার অজস্র ডাক ভেসে আসছে গ্রামে রাত ৮টা মানেই অনেক রাত।
হ্যারিকেনের আলোতে সবাই রাতের খাবার খেতে বসেছে।
ভাত আর কচুশাক।
টুলু দেখলো মার আর বুবুর প্লেটে সামান্যভাত আর আলুসিদ্ধ।
ঘরে তৈল না থাকায় তেলের অভাবে শুধু কাঁচামরিচ আর পেয়াজ দিয়েই সিদ্ধআলু ভর্তা করা কোনরকম।
মা লক্ষ্য করলেন টুলু খাচ্ছেনা মুখ ভার করে বসে আছে।
মায়ের বুঝতে বাকি রইলনা এ খাবার টুলুর পছন্দ না তবু মা বললেন কি হয়েছে বাজান?
পাতে ভাত নিয়া আর
কতক্ষণ বইসা থাকবি রে বাপ?তোর আব্বারে কমু নে কাল কা ভালো তরকারি কিইনা আনতে।
আজকা শাক দিয়া ভাত খাইয়া নে।
টুলুর ইচ্ছে করছিলো খাবারের থালা ছুড়ে ফেলে দিতে কিন্তু ক্ষিদে পেটের মধ্য মনে হচ্ছে কেউ ছুরি দিয়ে আঘাত করছে।
কোনরকম খাবার খেয়ে উঠে পরে টুলু।
টুলুর বাবা একজন হতদরিদ্র গরিব দিনমুজুর।
পরের কাজ করে যা পায় তা দিয়ে চাল ডাল কিনতেই হিমশিম খায় তারউপর টুলুর পড়াশোনা।
টুলু এখন ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ে।
টুলুর একটাই বোন অনেক কষ্টে আর্থিক অভাবের টানাপোড়ানের মধ্য দিয়ে ধার দেনা করে বিয়ে দিয়েছিলো বাবা টুলুর বোনকে।
কিন্তু ভাগ্য সহায় না থাকায় বিয়ের দেড় বছরের মাথায় টুলুর বোনের স্বামীর রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। এরপর গরীবের মেয়ের স্বামীর বাড়িতে ঠাই ঠাই মেলেনি দরিদ্রবাবার কাছেই ফিরে এসেছে।
এইসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে যায় টুলু।
.
সকালে পান্তা ভাত খেয়েই স্কুলের দিকে ছুটে যায় টুলু।
টুলু এখন ৬ষষ্ঠ শ্রেনীতে উঠেছে আগের থেকে পড়াশোনার চাপ অনেক বেশী।
কিন্তু তবু টুলুর বড্ড ভালো লাগে কারন যখন স্কুলে টিফিন দেয় তখন ১ঘন্টা পায় বিরতী এইসময়টা টুলুর কাছে খুব প্রিয় অবুঝ টুলুর কাছে তখন টিফিন শব্দটি বড় অচেনা।
যেখানে নিত্যদিন দুইবেলা ভাতের জোগার করতেই হিমশিম খেতে হয় সকালে খাবার জোটে পান্তা মরিচ
সেখানে টিফিন শব্দটি বাড়তি উপহাস ব্যাতীত আর কিছুইনা।
কিন্তু আজ টিফিনে টুলুর বন্ধু
রবীন আকাশ ওরা খেলতে আসেনা বরং ছোট ছোট প্লাস্টিকের বাটিতে খাবার নিয়ে স্কুলের মাঠের এক কিনারায় খেতে বসে।
দারিদ্রের সাথে লড়াই করে প্রতিনিয়ত বেচে থাকা টুলুর কাছে এই দৃশ্যপট বড়ই অদ্ভুত লাগে। আগ্রহ নিয়ে বন্ধুদের কাছে গিয়ে দেখে কারোর বাটিতে মাছের বড় টুকরো দিয়ে ভাত কারোর বাটিতে মাংসের তরকারি।
টুলুকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে রবীন বলে উঠে কিরে টুলু ঐভাবে চাইয়া আছোস ক্যান? জানিস না কারোর খাওনের সময় চাইয়া থাকতে নাই নজর লাগে নজর!
তোর মায়রে কইস তোর লাইগাও টিফিন দিতে।
রবীনের কথা শুনে বড্ড লজ্জা পায় টুলু দ্রুতপ্রস্থান করে বন্ধুদের কাছ থেকে।
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখে মা আর বাবার মাঝে খুব কথাকাটাকাটি চলছে।
এইসব দেখতে দেখতে অভ্যাস হয়ে গেছে টুলুর কিন্তু আজ বড্ড বিশ্রী বেমানান লাগে এইসব গন্ডগোলের ভীড়ে স্কুলের টিফিনের কথা বলতেই ভুলে যায়।
অনেকক্ষণ পর টুলু যায় মায়ের কাছে মা কেমন একটি থমথমে মুখ নিয়ে অন্ধকারের দাওয়াই বসে আছে।
টুলু আস্তে আস্তে মায়ের কোল ঘেষে বসে ক্ষীনস্বরে বলে মা আমারে একটা টিফিন বক্স কিইনা দিবা?
আমিও রবীনদের সাথে টিফিন খাবো।
অন্যদিন হলে মা কি বলতেন জানিনা তবে আজ বাবার সাথে গন্ডগোলে মায়ের মেজাজ এমনিতেই ভালো ছিলোনা মা ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠে দুইবেলা ভাত জুটেনা আবার টিফিন! টিফিন না খাইয়া আমারে খা। টুলুর ভীষন কান্না পায় সেইসাথে অভিমানও সে রাতে আর কোন কথা বলেনা টুলু কারোর সাথে।
.
সকালে আবার স্কুলে যায় টিফিনের সময় টুলুর নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে।
হঠাৎ বাবার কথা মনে পরে টুলুর বাবা তার স্কুলের পাশেই যে মস্তবড় বিল্ডিং টা বানানো হচ্ছে ঐখানে ইটভাঙা এবং খুচরাকাজ করে। টুলুর মনে হয় টিফিন বক্সের কথাটি বাবাকে বললে কেমন হয় বাবা ও কি মায়ের মতো রাগ করবে এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন স্কুলের মাঠ পেরিয়ে বড় বিল্ডিংটার কাছে চলে আসে টুলু।
বিল্ডিং টার দিকে তাকায় যেন মনে হয় বিশাল বড় একটি দানবীয় দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে বিল্ডিং টাকে দেখলে কেমন যেন মাথা ঘুরতে থাকে। চারিদিকে বিভিন্ন শ্রেনীর লোকজনের কাজকর্ম টুলুর বয়সী কয়েকটি ছেলেও কাজ করছে।
টুলু বাবাকে খুঁজতে লাগলো এক কোনায় দেখাগেলো বাবাকে কাঁঠফাটা রোদে বসে হাতুরি দিয়ে ইটভাঙছে শব্দ করে বাবার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে টুলু।
বাবার মুখটি কেমন মলিন
ছেড়া গেঞ্জির ফাক দিয়ে দেখাযাচ্ছে শীর্ণদেহ বাবা একনাগাড়ে ইটভেঙেই যাচ্ছে হঠাৎ হাতুরিটা ইটের উপর না পরে সোজা পরে বাবার বৃদ্ধাঙ্গুলিতে
বাবা ব্যাথায় ককিয়ে উঠে।
টুলু এক ছুটে যায় বাবার কাছে টুলুর হঠাৎ আগমনে টুলুর বাবা তাড়াতাড়ি হাত লুকাতে যায় কিন্তু ততক্ষনে আংগুলের মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে।
টুলু বাবাকে বললো বাবা তোমার হাত কেটে গেছে চলো ডাক্তারের কাছে টুলুর বাবা ছেলের অস্থিরতার দিকে তাকিয়ে হাসে আর বলে নারে বাজান তেমন কিছু হয়নাই সাইরা যাইবো তুই এইখানে ক্যান আইছোস বাপ??
টুলু ভেবে পায়না বাবার এই অবস্থায় কি টিফিন বক্সের কথা বলা ঠিক হবে??
টুলু বাবাকে বলে তোমারে দ্যাখতে মন চাইলো তাই আইছিলাম বাজান।
টুলু আবার বাবাকে বলে ডাক্তারের কাছে যেতে টুলুর বাবা বলে কাম না করলে খাবো কিরে বাপ? তুই আর এই রোদে থাকিস বাড়ি যা একপ্রকার জোর করেই বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় বাবা টুলুকে।
.
রাতে বাবার গায়ে ভীষন জ্বর আসে হাতের ব্যাথায় টুলু আস্তে আস্তে গিয়ে বাবার কাছে বসে।
অন্ধকারেই বাবা বুঝতে পারে টুলুর পায়ের অস্তিত্ব।
বাবা বলে টুলু তোর স্কুলে পড়া কেমন চলছে বাজান? টুলু জবাব দেয় ভালো টুলুর বাবা বলে সবই বুঝিরে বাপ আমারো ইচ্ছে করে তোরে ভালমন্দ খাওয়াইতো কিন্তু অভাবের তাড়নায় পাইরা উঠিনা। কিন্তু তুই চিন্তা করিসনা বাপ শরীর ভালো হইলেই কাজ কইরা এবার আগে তোর জন্য একটা টিফিন বাক্স কিইনা দিমু? টিফিন বক্সের কথা শুনেই খুশিতে ঝলমল করে উঠে টুলুর মুখ সে বাবাকে বলে সত্যি বাজান তুমি আমারে কিইনা দিবা টিফিনবক্স? আমিও টিফিন নিয়া যামু স্কুলে? টুলুর বাবা ছেলেকে আশ্বাস দেয় খুশিতে টুলু বাবার কাছে আরেকটা আবদার করে ফেলে টুলুর আবদার টিফিন বক্সে সেও রবীনদের মতো মাংস ভাত নিয়ে যাবে।
ছেলের এমন আবদারে টুলুর বাবা কি বলবে উত্তর পায়না দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে বেচে থাকা মানুষগুলো দুমুঠো চাল কিনতেই যেখানে দিনশেষে সর্বশ্রান্ত সেখানে মাছ মাছ একটা জাদুকারী শব্দ মাত্র।
তবুও ছেলের আবদার বাবা কখনোই ফেলতে পারেনা।
.
কয়েকটা দিন বাবা অসুস্থ থাকায় তেমন ঠিকঠাক কাজ করতে পারেনা।
সেইদিন বাবার শরীর ভালো থাকায়
সকাল সকাল কাজে যায়।
টুলুও অপেক্ষায় থাকে বাবার ফেরার।
এইদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে আসে তবু বাবা ফেরেনা টুলুও অধীর আগ্রহে বাবা আসার পথে তাকিয়ে থাকে।
দূর থেকে বাবাকে দেখা যায় টুলুর বুকের মধ্য কেমন ধুকপুকানি বেড়ে যায় বাবা কি সত্যি আজ আনবে টিফিনবক্স?
বাবা সেদিন বাজারের থলিটা নিয়ে হাসতে ঘরে ঢোকে বাজারের থলিটা মায়ের হাতে না দিয়ে আজ টুলুর হাতে দেয় বাবা।
টুলু বাজারের থলি খুলে দেখে আজ শাকপাতার পরিবর্তে বাবা মাংস কিনে এনেছে।
খুশিতে সারাদিনের খিদের অভাব মিটে যায় টুলুর পরক্ষনেই টিফিন বক্সের কথায় আনন্দ চুপসে যায়। বাবার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকালে
এইবার বাবা হাসি দিয়ে আরেকহাতে লুকিয়ে রাখা লাল রংবেরং এর টিফিন বক্স্যটি তুলে দেয় টুলুর হাতে। টুলু যেন স্বপ্ন দেখে এমন মনে হয় খুশিতে জড়িয়ে ধরে বাবাকে।
মা রাগ করে বাবাকে বলে টিফিন বক্স না হয় আনছো মাংস আনার কি দরকার ছিলো এমনিতেই সংসারে যে অভাব চলছে।
মায়ের কথায় কর্ণপাত করেনা বাবা বাবা বুবুকে বলে ভালো করে মাংস রান্না করতে আর কালকের টিফিনে মাংস ভাতে দিয়ে নতুন টিফিনবক্স দিতে।
সেদিন টুলুদের ঘরে একটা বড় উৎসবের আমেজ চলে আসলো।
বুবু শাড়ির আচলকে কোমড়ে গুজে জিরা মসলা বাটতে বসে গেলো। টুলু মাংস মাংসগুলোকে বারবার নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলো।
খানিকটা দূরে বসে ছেলের আনন্দ দেখে বাবাও ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলেন।
বুবু তৈল মশলা দিয়ে পাতলা ঝোল ঝোল করা মাংস চুলা থেকে নামিয়ে সবাইকে খেতে ডাকলেন। টুলু দেখলো সবাই দুইপিসের বেশি খাচ্ছেনা তবু মুখে কত তৃপ্তি খুশির আমেজ।
টুলুও রাতে বেশি মাংসের টুকরো খেলোনা কারন কাল টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে যাবে সে তার স্বপ্ন অবশেষে পুরুন হবে।
সারারাত অদ্ভুত ভালো লাগায় ঘুমই ঠিকমতো হলোনা টুলুর।
.
পরের দিন সকালে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নতুন টিফিন বক্সটি ব্যাগে ঝুলিয়ে স্কুলে চলে গেলো টুলু। কিন্তু সেইদিন ছিলো বৃহস্পতিবার
হাফ স্কুল।
টুলুর খেয়ালই ছিলোনা বৃহস্পতিবার হাফ ক্লাস হয় টিফিন দেয়না।
কেন যেন মনটা খারাপ হয়ে যায় তার কত আশা করে টুলু আজ টিফিন এনেছিলো কিন্তু আজ টিফিন নেই।
একটা ক্লাস শেষ হবার পরে স্কুলের মাঠের সেই পাশের বিশাল বড় দৈত্যর বিল্ডিং থেকে খুব চেঁচামিচির আওয়াজ ভেসে আসে।
অনেক ভীড় দেখা যায় টুলু ভীড় ঠেলে গিয়ে দেখে
বাবা পরে আছে সেই দৈত্য আকৃতি বিল্ডিং এর নীচে।
উপর থেকে একটি পিলার ভেঙে নিচে পড়েছে আর একদম বাবার বরাবর টুলু দেখলো বাবার মাথাটা বিভৎস রকম থেঁতলে গেছে রক্তে ভেসে যাচ্ছে পথ।
টুলু এক চিৎকার দিয়ে লুটিয়ে পড়লো বাবার উপর টুলুর হাত থেকে গড়িয়ে পড়লো টিফিন বক্স।
টুলুর আহাজারিতে কেপে উঠলো নতুন বিল্ডিং।
প্রতিধ্বনিতে ফিরে আসতে লাগলো টুলুর প্রতিটি আহাজারির শব্দ আর পাশে অবহেলায় গড়িয়ে পড়ে থাকলো সদ্য চকচকে নতুন টিফিন বক্স।
অধরাই থেকে গেলো টুলুর লালিত স্বপ্ন।
টিফিন খাওয়ার স্বপ্ন টিফিন বক্সেই বন্দী হয়ে থাকলে অতি যত্নে।
ভাগ্য বুঝি এমনই হয় অনেক সময় ধরা দিয়েও এইভাবে বাক্সবন্দি হয়ে যায়।
-
লিখেছেনঃ অবন্তি রাহমান।
Author: Jahid
Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.



0 Comments: