খাম ভর্তি সুখ

গল্প নং: (১৬)
নামঃ খাম ভর্তি সুখ।
-
ক্লাস শেষে বন্ধুরা সবাই ঠিক করেছে বাইরে কোথাও একসাথে লাঞ্চ করবে। জনপ্রতি চাঁদা ৩০০ টাকা। চাঁদা নিয়ে কারোই আপত্তি নেই। আমারও কোন আপত্তি থাকতে নেই, কিন্তু আমি যাব না। একে একে সবাই জিজ্ঞেস করছে কেন যাবি না? চল, গেলে মজা হবে।
আমার এক কথার উত্তর- বাবার শরীরটা ভাল না তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। "কি হয়েছে আংকেলের"?
কিছুদিন থেকে বেশ অসুস্থ। আচ্ছা তোরা থাক তাহলে, আমি যাই। বলে হাটতে শুরু করলাম।
.
সকালে ক্লাসে আসার সময়, ভাড়া চাইতেই মা বলল, বাবা আজ একটু চালিয়ে নিতে পারবি কি?
মার মুখের দিকে তাকিয়েই অনেক কিছু বুঝতে পেরেছি, সেখানে অনেকগুলো চিত্র একসাথে ভাসছে- বাবার শরীরটা ভাল নেই, কদিন থেকে কাজে যেতে পারছে না, মার হাতে টাকা নেই।
সকালে তরকারিতে কাঁচামরিচের যায়গায় শুকনা মরিচ, পেঁয়াজের কোন বালাই নেই দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম, পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ শেষ, বাজারও প্রায় শেষের পথে।
.
গতকাল ক্লাসে যাবার সময় মা ১০০টাকার একটা নোট শাড়ীর আচল থেকে বের করে দিয়েছিল, তা থেকে এখনও অবশিষ্ট ৪০টাকা মানিব্যাগের কোনে পরে আছে।
.
মাঝে মধ্যেই ক্লাস শেষে হেটে হেটে বাসায় চলে আসি। হাটতে আমার মন্দ লাগে না বরং নিত্য নতুন অনেক অনেক অভিজ্ঞতা মনের বাক্সে বন্দী হয়। যেমন চোখে কালো চশমা পরে বছরের পর বছর ঠিক একই যায়গাতে অন্ধ সেজে ভিক্ষা করতে থাকা লোকটা যে অন্ধ না, মাঝে মধ্যে হেটে হেটে না আসলে হয়তো আর জানাই হত না। হেটে আসার আরেকটা সুবিধা হচ্ছে এতে করে ২০ টাকার গাড়ি ভাড়া বেঁচে যায়। কাল ভাড়া চাইলে মা নিশ্চয়ই কারও কাছ থেকে ধার এনে দিবে, অথবা আজই এনে রেখে দিয়েছে কাল চাওয়ার সাথেই আচলের ভাঁজ থেকে বের করে দিবে।
.
মাসের আজ ২৫ তারিখ। সন্ধ্যার পর টিউশনিতে যাবার সময় ভাবছিলাম অগ্রিম বেতন চাইব কিনা! কিন্তু কি করে চাইব? আন্টি প্রতিমাসের ২ তারিখে নিজেই একটা খামে টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে যায়।
.
স্টুডেন্টকে পড়াতে গিয়ে বার বার মনে পরছিল, বাবা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে আছে, মা নিশ্চয়ই কোন কোন বাড়িতে গিয়ে ধার চেয়ে খালি হাতে ফিরে আসছে। ছোট বোনটার মায়াবী মুখ বার বার স্টুডেন্টের খাতায় ভেসে আসছে। ও নিশ্চয়ই মা'র কাছে আইসক্রিম, চিপস কিনে দেয়ার বায়না ধরছে।
স্টুডেন্টকে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার আম্মু কোথায়? “বসার ঘরে টিভি দেখতেছে মনে হয়”।
লজ্জার মাথা খেয়ে বসার ঘরে গিয়ে আন্টিকে বললাম, আন্টি এইমাসের বেতনটা কি আজকে দেয়া যাবে? আন্টি বলল, বেশি দরকার?
জি আন্টি।
.
আন্টি কিছুক্ষণ পর এসে একটা খাম দিয়ে গেল। এই খামটার ভেতরে অনেক গুলো অদৃশ্য সুখ বন্দী রয়েছে। অনেকগুলো চিন্তা থেকে মুক্ত হবার যাদু রয়েছে। আত্মতৃপ্তি আর ছোটবোনের মুখের হাসি বন্দী রয়েছে।
.
পড়ানো শেষ করে বাড়ি ফেরার সময় বাজার করে নিয়ে এসে মাকে দিয়ে বললাম, কারও কাছ থেকে ধার করতে যেও না। খামটা পকেট থেকে বের করে হাতে দিয়ে বললাম, কাল সকালে ভাড়া দিও।

-
লিখেছেনঃ নাহিদ হাসান নিবিড়।


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 Comments: