পাএীপক্ষ

নং: (১৫)
নামঃ পাত্রীপক্ষ।
-
গতকাল সাতটি বিয়ের দাওয়াতের মধ্যে থেকে সবচেয়ে দূর্গম গ্রামের বিয়েটিতে উপস্থিত হয়েছিলাম। গ্রামের জন্য নয়, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর্থিকভাবে যিনি সবচেয়ে অসচ্ছল, সে দাওয়াতটায় যাবো। দারুণ আয়োজন। কত্তদিন পরে নিখাঁদ গ্রাম্য বিয়ে দেখলাম। কলাগাছ দিয়ে তৈরি করা গেট, সেখানে বরযাত্রীকে আটকিয়ে টাকা আদায়, ছো৫ট্ট ছোট্ট মেয়েদের গান গেয়ে গেয়ে বর আর তার বন্ধুদেরকে কাগজের ফুলের মালা পরানো, খাবার পরে বরের হাত ধুইয়ে টাকা আদায়, উফ্ কি যে প্রাণের উৎসব, না দেখলে বোঝানো যাবেনা!
.
মূল প্রসঙ্গে আসি। গাছের নীচে সামিয়ানা টাঙিয়ে নীচে চেয়ার-টেবিলে খাবার আয়োজন। এক টেবিলের উভয় পার্শ্বে চেয়ার। আমার সামনাসামনি বসেছে ২০-২২ বছরের এক তরুণী। তাকে দেখে রবীন্দ্রনাথের "স্ত্রীর পত্র"- এর বিন্দুর কথা মনে পড়ে গেল। মৃণালিণী বিন্দুর চেহারার বর্ণনা দিতে গিয়ে যেভাবে বলেছিলেন, " পড়ে গিয়ে মাথা ভাঙলে লোকে বরং মেঝেটার জন্য আফসোস করবে..।" কালো মানুষের সৌন্দর্য্য আমার বেশি প্রিয় কিন্তু যখন কোন কালো মেয়ে নিজের রঙ-এর প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে লাল-সাদা রঙ মেখে আর ঘাড়-গলা ভর্তি পাউডার দিয়ে নিজেকে ফর্সা বানাতে চায় তখন মৃণালিনীর কথাকেই আমার যথার্থ মনে হয়।
.
মেয়েটি খেতে বসেই স্ট্রেইট বলে দিলো, "আমি কিন্তু গরু-খাসি খাইনা। মুরগীর গোশত আনুন।" যে বেচারা খাবার পরিবেশন করছিল, অপ্রস্তুত হয়ে জানালো, যারা গরুর গোশত খাবেনা তাদের জন্য বিকল্প হলো খাসি, যে সেটাও খাবেনা তার জন্য যে বিকল্প নেই।
.
মেয়েটি মুখ বাঁকিয়ে বললো, " কেন, তা হবে কেন! বিয়ে বাড়িতে তো গরু-খাসি-মুরগী-মাছ সবই থাকে। আপনাদের নেই কেন!"
.
যাহোক, আমরা সবাই খাচ্ছি, মেয়েটা শুধু চর্বি দিয়ে রান্না করা বুটের ডাল দিয়ে ভাতগুলো নাড়া চাড়া করতে লাগলো আর চিৎকার করতে থাকলো।
.
আপনারা নিশ্চয় মেয়েটির তেজ দেখে বুঝে গেছেন যে, মেয়েটি পাত্রপক্ষের মূল্যবান অতিথি। বেশ কিছুক্ষণ হলো আমরা খাওয়া চালিয়ে যাচ্ছি। মেয়েটির অবস্থা দেখে একটু সংকোচ করে বলেই ফেললাম, আপা অল্প একটু গরুর গোশত খান, কিছু হবেনা। পোড়া পোড়া করে রান্না করা গরুর গোশতটা কিন্তু দারুণ হয়েছে। মেয়েটা আমতা আমতা করে বললো,"কিন্তু আমি যে খাই না"।
.
-আজকে একটু খেয়েই দেখেন না, ভালো লাগবে। তাছাড়া বিকল্প যেহেতু নেই, ডাল খাওয়ার চেয়ে গোশত খাওয়া ভালো, তাই না?
.
-আচ্ছা, তাহলে অল্প একটু খেয়েই দেখি, কি বলেন। তবে আপনি যেটা ভালো বলছেন, ওরকম ভালো হবেনা। কালো বিশ্রী দেখতে। দেখেই তো বমি বমি ভাব করছে।
.
আমি গোশত পরিবেশনকারীকে ডেকে মেয়েটিকে গোশত দিতে বললাম। মেয়েটি ধমকের সুরে বললো, " খবরদার একটুও যেন ঝোল না পড়ে। যেটুকুই দিবেন ফ্রেশ গোশত দিবেন। এ্যাই, এটা কি দিলেন, এটা তো রাবারের মত লাগছে, এটা খাওয়া যায়! দেখি আমার কাছে নিয়ে আসেন, আমি নিজে বেছে বেছে তুলে নিবো।"
.
বেচারা গোশতওয়ালা ঝাড়ি খেতে খেতে আর মুরগীর গোশতের ব্যবস্থা না করতে পারার লজ্জা ঢাকতে গোটা গোশতের বালতি মেয়েটার সামনে রাখলো। তারপর মেয়েটা "গরুর গোশতের মধ্যে আমি শুধু কলিজাটা খাই, হাড্ডিওয়ালা দু-এক পিস খাই, চর্বি না থাকা গোশত একটু খাই" করে করে যে পরিমাণ গোশত খেলো, তা বলে বুঝানোর চেয়ে সামনে জমানো হাড্ডিগুলোর ছবি তুলে পাঠককে দিলে সহজে বুঝানো যাবে মনে করে, মোবাইলটা বের করে ছবি তুলতে যাবো  এরকম সময় মনে হলো আমি পাত্রীপক্ষ।
.
খাবারের পরে কণে কে নিয়ে নানারকম ব্যঙ্গাত্নক কথায় মনটা ভারি হয়ে গেল। কেউ বলছে, মেয়েটা আসলে বোধ হয় ফর্সা নয়, মেকাপ করে ফর্সা সেজেছে, কেউ বলছে মেয়ে ঠিক আছে কিন্তু মেয়েদের বাড়িটা এখনো প্লাস্টার করেনি কেন ইত্যাদি। একজন বললো, কলেজে ভর্তি হওনি কেন, এখন স্কুল পাস মেয়েদের কোন দামই নাই। আমাদের বর একবার অক্ষরজ্ঞানশূণ্য আবার তুমিও হয়ে গেলে শুধু স্কুল পাস, তাহলে কিভাবে হবে!
.
সমাজের প্রত্যেকটি স্তরেই মেয়েপক্ষ আজ আমার মত নিশ্চুপ। প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ। বরের অযোগ্যতা ঢাকতে প্রবাদ বাক্য চালু করেছে এই সমাজ," সোনার আংটি বাঁকাও ভালো।" এ সমাজে ছেলে হলো সোনা। সে যত বাঁকাই হোক, নো প্রবলেম। মেয়েরাও হীনমণ্যতায় ভূগে। কোন রকমে একটা চাকুরিওয়ালা বর পেলেই হলো! যার ফলে বিয়ের কিছুদিন পরেই সোনার বাঁকা আংটির সংসারে গিয়ে হয় সে বেছে নিচ্ছে, আনপেইড সার্ভেন্টের পদমর্যাদা অথবা আত্নবিশ্বাস হারিয়ে তালাকপ্রাপ্তির সনদ নিয়ে বাপ-ভাইয়ের বাড়ির অতি অল্প জায়গাজুড়ে থাকছে ঐ সার্ভেন্ট হয়েই।
.
নারীর এই দূর্দশা চিরন্তন। বিবি হাওয়া, আদম(আঃ) কে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে গন্ধম(নিষিদ্ধ ফল) খাইয়েছিলেন বলে প্রচার করে কেউ কেউ। অথচ আল-কুরআনের কোথাও সেরকম কোন দলিল নেই বরং ১১৪ টি সুরার মধ্যে পুরুষ প্রজাতির নামে না থাকলেও নারীদের মর্যাদা এবং অধিকার সংক্রান্ত একটি স্বতন্ত্র সুরা সংযোজিত আছে। যার নাম " সুরা-নিসা"।
.
রাসূল (সাঃ) বাজারের দিকে যাওয়া এক সাহাবীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, "কোথায় যাচ্ছো?" সাহাবী বললেন, "ইয়া রাসূলুল্লাহ, বাজারে যাচ্ছি ছেলের জন্যে পোষাক কিনতে।" রাসূল (সাঃ) বললেন," তোমার মেয়ে নেই?" সাহাবী হ্যাঁ বললে রাসূল (সাঃ) বললেন, " আগে মেয়ের জন্য পোষাক কিনবে। তারপর টাকা থাকলে ছেলের জন্যে কিনবে।"
.
বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে দেখা সেই অসহায় কণেটির কথা মনে পড়ছে, তালাকপ্রাপ্ত অনেক পরিচিতজনদের চেহারাও চোখের সামনে ভাসছে, চোখে ভাসছে আমার নিজের দুটো মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছবিও।
-

লিখেছেনঃ আসাদুজ্জামান জুয়েল।


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 Comments: