গল্প নং: (০৭)
নামঃ চন্দ্রার উপহার।
-
যখন খুব মন খারাপ হয় অথবা নিজের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে তখন হাঁটতে হাঁটতে বাসন্তীর তীরে যাই। এমন স্বচ্ছ পানি যে নদীতে হতে পারে তা না দেখলে বোঝা যাবেনা।
নদীটির যেখানে ঘাট বাঁধা, সেখানে ছোট্ট একটা নৌকো থাকে সব সময়। মার্বেল পাথর দিয়ে বাঁধাই করা ঘাটের চারপাশে নানা রঙের গাছ পালার কারণে সুনসান নীরবতা বিরাজ করে।
ঘাটের উপর বসে পানিতে পা চুবিয়ে দিই। গাছগুলোতে তিলা ঘুঘু আর কাঠবিড়ালির ডাক শুধু নীরবতা ভাঙে। এখানেই বসে বসে কত পূর্ণিমার রাত ভোর করেছি বোঝাতে পারবো না আপনাকে।
নদীটির নাম এরকম অদ্ভূত হলো কেন ভাবছেন তো? না না বসন্ত ঋতু থেকে এর নাম বাসন্তী হয়নি। চন্দ্রার বসন্তবৌরী পাখি খুব পছন্দ ছিল। সে পাখির নাম থেকেই সে নদীটির নাম দেয় বাসন্তী নদী।
চন্দ্রার সাথে পরিচয়ের কথা তো আপনাকে আগেই বলেছি। আমার অনার্স ক্লাসের প্রথমদিনেই তাকে আলাদাভাবে চোখে পড়ে। পরে তার সাথে "জীবনেও প্রেমের প্রস্তাব দিবো না" শর্তে বন্ধুত্ব হয়। বন্ধুত্বের প্রায় এক বছর পরে আমার জন্মদিনে চন্দ্রা একটা গিফট নিয়ে আসে আমার জন্য। অনেক বড় আর জমকালো প্যাকেটে মোড়ানো। চন্দ্রা প্যাকেট খুলতে বলে। আমি খুলতে রাজি হই না। আমার উদ্দেশ্য ছিলো, রুমে গিয়ে মাঝরাতে লাইট অফ করে মোমের আলোতে প্যাকেটটা খোলা।
চন্দ্রার নির্দেশে খুলতে বাধ্য হলাম। বিরাট প্যাকেট খুলে আমি তো বোকা বনে গেলাম। প্যাকেটের মধ্যে কিছু নেই। পুরো ফাঁকা।
-এটা কি হলো! আজ তো এপ্রিলের প্রথম দিন নয়। বোকা বানালে কেন?
-বোকা তো বানাইনি।
-ফাঁকা প্যাকেট গিফট দিয়ে বলছো, বোকা বানাওনি?
আমার ঈষৎ রাগান্বিত স্বরে চন্দ্রা বললো, "চোখ খুলে তো সব উপহার দেখা যায়। এটা দেখতে হলে চোখ বন্ধ করতে হবে।
-আশ্চর্য তো! চোখ বন্ধ করলে দেখবো কিভাবে!
-আগে তো চোখ বন্ধ করো।
-আচ্ছা বন্ধ করলাম। কৈ, কিছুই তো দেখছি না।
-দেখতে পাবা। আমি যেভাবে বলবো, সেভাবে দেখবা।
-ঠিক আছে দেখাও।
আমি চোখ বন্ধ করলাম। চন্দ্রা বলতে লাগলো আর আমি সেভাবেই দেখতে লাগলাম।
-একটা ছোট নদী। সুনসান। অনেক দূরে ওপাশের পাড়টা আবছা দেখা যায়, দেখতে পাচ্ছো?
-হ্যাঁ পাচ্ছি।
-নদীর পাড় জুড়ে একটা মার্বেল পাথরে বাঁধা ঘাট, দেখতে পাচ্ছো?
-হ্যাঁ পাচ্ছি।
-ঘাটের চারপাশে অসংখ্য গাছ। গাছের ডালে পাখিরা বসে অাছে। দেখতে পাচ্ছো?
-হ্যাঁ। দেখতে পাচ্ছি। চেরি ফুলগুলোও দেখতে পাচ্ছি। আচ্ছা, একটা পাখির ডাকও শুনতে পাচ্ছি। কি পাখি ওটা? তিলা ঘুঘু না?
-হ্যাঁ ঠিক ধরেছো। ওর পাশের ডালে যে পাখিটি দেখছো, ওটা কিন্তু মাছরাঙা নয়। ওটা বসন্তবৌরী।
-ওমা তাই নাকি! একদম মাছরাঙার মতই। সবুজ শরীর , লাল ঠোঁট।
-হুম।
-আচ্ছা, এই বসন্তবৌরীর চোখের মত স্বচ্ছ পানির নদীটির নাম কি?
-বাসন্তী নদী।
-বাহ। নামটাও অনেক সুন্দর। এবার কি চোখ খুলবো চন্দ্রা?
-হ্যাঁ, খোলো।
চোখ খুলতেই চন্দ্রা বললো,"গিফট পছন্দ হয়েছে তোমার?"
-অনেক পছন্দ হয়েছে।
-কাউকে কিন্তু নিয়ে এসো না বাসন্তীর পাড়ে। শুধু তুমি আসবে। এ নদী তোমার একার।
সেই থেকে বাসন্তী আমার ব্যক্তিগত নদী। মন খারাপ থাকলে এর ঘাটে বসে পানিতে পা চুবিয়ে দিই। পূর্ণিমার রাতে ঘাটে বসে ঢেউয়ের শব্দ শুনি।
না না, কাউকেই নিয়ে আসিনি এখানে কখনো। একদিন শুধু একবারের জন্য চন্দ্রা এসেছিল এখানে।
একদিন হঠাৎ করে চন্দ্রাকে দেওয়া কথার বরখেলাপ করে তাকে জানিয়ে দেই যে, আমি তাকে ভালবাসি। চন্দ্রা প্রথম প্রথম বোঝাতে চায় যে, আমরা শুধুই বন্ধু। আমার একগুয়েমি ছেলে মানুষী দিয়ে বলি, "তুমি ভালবাসবে কি না বলো? ভাল না বাসলে আমি আর পড়ালেখা করবো না। বাদ যাক আমার অনার্স পড়া। আজই আমি ব্যাগ প্যাটরা গুছিয়ে বাড়ি চলে যাবো।"
চন্দ্রা বললো, "তোমাকে ভালবাসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা ভাল বন্ধু থাকতে পারি। তার বেশি কিছু নয়।"
আমি হোস্টেল ছেড়ে বাড়ি চলে গেলাম। আব্বা-আম্মাকে বললাম, আর পড়বো না। তাদের চেষ্টা তদবীরে এক মাস পরে মনে হলো, হোস্টেল ছেড়ে আসা ভুল হয়েছে। সেখানে থাকলে অন্তত চন্দ্রাকে দেখতে তো পেতাম!
আবার ফিরলাম, হোস্টেলে। চন্দ্রা খবর পেয়ে দেখা করতে আসলো। বললো, "চলো বাইরে যাই।"
আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটা নিরিবিলি সর্ষে ক্ষেতের পাশে এসে দাঁড়ালাম। চন্দ্রা বললো, "তোমার বাসন্তী নদীর ঘাটে একটু বসতে চাই।"
-"ঠিক আছে বসো।"
-জানো, কালকেই তোমাকে লেখা চিঠিটা পোস্ট করতাম। ফিরে আসতে বলতাম। বলেই চন্দ্রা কাছাকাছি হওয়ার চেষ্টা করলো। আমি একটু সরে বসলাম।
-ওমা সরে যাচ্ছো কেন, একটু গা ঘেঁষলে কি হয়!
-আমার ভাল লাগেনা চন্দ্রা।
-জুয়েল, আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে।
-সেকি! আচ্ছা দাঁড়াও। আমি কাছে কোথাও খাবার পাই কিনা দেখি।
চন্দ্রা দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে বললো, "অন্য কিছু খাবো।"
আমি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকালাম।
চন্দ্রা অট্ট হাসিতে ফেঁটে পড়লো।
পরের কয়েকটা দিন চন্দ্রার সাথে দেখা হলো না। আমি নিয়মিত বাসন্তী পাড়ে পা ডুবিয়ে বসে বসে চন্দ্রাকে ভাবতে লাগলাম।
হঠাৎ একদিন চন্দ্রা হোস্টেলে এলো। হাতে একটা চিঠি দিয়ে বললো, " আমি একটু বাইরে যাচ্ছি কিছুদিনের জন্য। আগামীকাল চিঠিটা পোড়ো।"
আমি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। পূর্ণিমার রাতে, বাসন্তী পাড়ে বসে চন্দ্রার চিঠিটি খুললাম। ঝকঝকে অক্ষরে লেখা, "তোমাকে ভীষণ কাছের একজন বন্ধু ভেবেছি। কখনো কখনো হয়তো বন্ধুত্বের সে গন্ডিও পেরিয়ে গিয়েছি কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে হারাতে চাই না। তোমাকে কাছে পাওয়া মানে, পেয়েই যাওয়া। আমি তোমাকে খুঁজতে চাই। হারিয়ে দিয়ে পথে পথে খুঁজতে চাই। আর বিধাতার কাছে প্রার্থণা করি, তোমাকে যেন আজীবন খুঁজে না পাই। তুমি আর বিধাতা দুইই আমার কাছে আরাধ্য থাকো। চোখ বন্ধ করে তুমি বাসন্তীকে যতদিন পাবে, বিশ্বাস রেখো, ততদিন আমিও তোমাকে খুঁজে ফিরবো।"
সেই থেকে আমি এখনও বাসন্তীপাড়ে তিলা ঘুঘুর ডাক শুনি। আপনি ভাবছেন, চন্দ্রা পাগলামী করেছে? আমার তা মনে হয় না। মনে হয়, সে ঠিক কাজটিই করেছে। তাকে পাইনি বলেই তো আসলে আরো বেশি করে পেয়েছি। বাসন্তী আর চন্দ্রা দুজনই আমার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে আছে।
-
লিখেছেনঃ আসাদুজ্জামান জুয়েল।



0 Comments: