কাব্যিক ভালোবাসা

গল্প নং: (০৬)
নামঃ কাব্যিক ভালোবাসা💘
-
এই পৃথিবী নামক ছোট্ট গ্রহটিতে কত গল্পই না আছে, কিছু গল্প প্রকাশ পায় মাথা উঁচু করে, আবার কিছু গল্প থেকে যায় সবার অগোচরে কারও ডায়েরীর প্রতিটি পাতায়। আজ আমি আপনাদের এমন একটি গল্প বলব, যা সবার অগোচরে ডায়েরীর পাতায় বন্ধী অবস্থায় ছিলো।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এর বাংলা বিভাগের ১ম বর্ষের ছাত্র অভ্র। বড়লোক পরিবারের ছেলে, তবে খুবই যে মডার্ন তা নয়, কবি কবি ভাব আছে তার মধ্যে। সারাদিন বই পড়া, লেখালেখি, কবিতা আবৃতি করা, কবিতা লেখা ইত্যাদি কাজেই কাটিয়ে দিচ্ছে সময়। মাঝেমধ্যে তার দু'একটা লেখা পত্রিকার পাতায়ও প্রকাশিত হয়। প্রচুর সাহিত্যমনা, তাই তো বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হয়ে এতো ভালো ফলাফল করেও বাংলা নিয়েই পড়ছে। ভবিষ্যতে একজন লেখক হওয়ার স্বপ্ন তার। আর হুম অভ্র কিন্তু ছোটবেলা থেকে ভালো ছবিও আঁকে। বলতে গেলে এক প্রকার শখ। এইসব শৈল্পিক গুণাগুণ থাকায় ক্যাম্পাসে খুব অল্পসময়েই পরিচিতি লাভ করেছে সে।
আর এদিকে ক্যাম্পাসে নতুন এসেছে নীরা। নীরাকে প্রথম দেখেই তার দিকে এক নজরে চেয়ে রইল অভ্র। তার মুখের দিকে নয় বরং তার হরিণা চোখ আর এলোমেলো কালো কেশের দিকে। কেনই বা তাকাবে নাহ? রূপের দিক দিয়ে নীরা ছিলো ক্যাম্পাসের অন্যতম সুন্দর রমণী। কিন্তু প্রেম ভালোবাসার উপর একদমই বিশ্বাস নেই তার। তার কাছে এইগুলোর কোনো মূল্যই নাই। উপমা ধরে বলতে গেলে সে ভালোবাসাকে অনেকটা শীতকালের গাছের ঝরে যাওয়া শুকনো পাতার মত মনে করে। তবে কবিতা ও উপন্যাস পড়তে ভীষণ ভালোবাসে সে।
সেইদিনই যেন অভ্র তার কবিতার নায়িকাকে খুঁজে পেয়েছে।
একদিন বিকেল বেলা, ক্যাম্পাসের বারান্দায় দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে বই পড়ছিলো অভ্র। তখনি নীরা তার সামনে দিয়ে হেটে গেল। অভ্রের কাছে পুরো ব্যাপারটায় স্লো-মোশন মনে হতে লাগল। বাতাসের ঝাপটাই নীরার খোলাচুল এলোমেলো হওয়া, পিছন ফিরে তাকানো সেই আড়চোখের দৃষ্টি, সবকিছুই যেন খুব স্লো-মোশন হতে লাগল অভ্রের কাছে। নীরা অভ্রের একটু সামনেই এগিয়ে তার বান্ধুবীদের সাথে কথা বলছিলো আর বাতাসের অবিরাম হাওয়া তার খোলাচুলকে নাড়িয়েই যাচ্ছিলো। আর অভ্র এই প্রথম নীরার খোলাচুলের ছবি আঁকছিলো। অভ্র নীরার ভালোবাসায় তো সেইদিনই পড়েছিলো যেইদিন তাকে প্রথম দেখেছিলো। আজ তার ভালোবাসা আরো তীব্র হল। তাই অতকিছু না ভেবে অভ্র নীরার কাছে চিঠি লিখে পাঠালো। তাতে লিখা ছিলো, ‘ভালোবাসি'।নীরা চিঠিটা পাওয়ার পর খানিকটা বিচলিত হল, তারপর চিঠিটার প্রতিউত্তর দিল, ‘শীতকাল চলছে, শীতে গাছের ঝরে যাওয়া পাতা যেখানে অস্তিত্বহীন সেখানে তোমার ভালোবাসা আমার কাছে একরাশ ঝরে যাওয়া শুকনো পাতা ছাড়া আর কিছুই না।' চিঠিটা পেয়ে অভ্র একটুও বিচলিত হল না, বরং তার নীরাকে আরও ভালো লাগল। মনে মনে বলতে লাগল, ‘মেয়েটা সাহিত্যমনা টাইপের।'
আগেই বলেছিলাম অভ্র সাহিত্যমনা, যদি তার প্রেমিকাও সাহিত্যমনা টাইপের হয়, তাহলে তো কথায় নেই। অভ্র নীরার কাছে আবার চিঠি লিখল, ‘যদি ভালোবাসাকে ঝড়ে যাওয়া শুকনো পাতার সাথে তুলনা কর, তবে জেনে রেখো, যে শহরের প্রতিটি রাস্তায় সবাই ভালোবাসা খুঁজে, সেই শহর আজ ঢেকেছে শুকনো পাতায়। আর আমি তোমার হাত ধরে সেই পাতার মড় মড় শব্দ শুনে হাটতে চাই।' চিঠিটা পেয়ে নীরা এবার একটু হাসলো। সে আবার অভ্রের চিঠির উত্তর দিল, ‘প্রেম-ভালোবাসা কি আমি জানি না, কখনো এদের ছোঁয়া পায় নি, জানিনা এদের অনুভূতি কী? আমি বিশ্বাস করি না প্রেম-ভালোবাসা বলতে আধৌ কিছু আছে!'
চিঠিটি পেয়ে অভ্র এবার ক্লান্তির নিশ্বাস ছাড়ল। সে আবার একটি চিঠি লিখল। এইবারের চিঠিটি লিখতে অভ্র একটু সময় নিল।
“প্রিয়তমা নীরা,
প্রেম কি? ভালোবাসা কি? এদের অনুভূতি কেমন? আধৌ এদের অস্তিত্ব আছে কিনা, তা আমি তোমাকে না দেখলে বুঝতামই নাহ। তোমার সেই খোলাচুলের রূপ আর আড়চোখের চাহনির প্রেমে পরে গিয়েছি। জানি তুমি প্রেম ভালোবাসায় বিশ্বাসী নও। কখনো যদি সময় পাও তবে একটি শান্ত স্নিগ্ধ বিকেলে নিজের গায়ে হিমেল হাওয়া মেখো, তুমি সেই বাতাসে তোমার প্রেমের অস্তিত্ব খুঁজে পাবে। যদি এরপরও প্রেমের অস্তিত্বের ছোঁয়া না পাও, তবে নীল শাড়ি পরে, কপালে একটি কালো টিপ দিয়ে, হাতে লাল-নীল রেশমি চুড়ি পরে, কানের উপরের চুলে রজনীগন্ধা ফুল গুঁজে, চোখে গাঢ় করে কাজল মেখে আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে দেখো, তবে তুমি তোমার প্রেমে পরে যাবে। তবুও যদি তুমি প্রেমকে অনুভব না করো, তবে কোনো এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে পায়ে নূপুর পরে নগ্ন পায়ে শিশিরে ভেজা ঘাসের উপর হেটে দেখো কেমন লাগে। তোমার নূপুরের গুঞ্জনের নেশায় শীতের মিষ্টি সূর্য হয়ে তোমাকে আলতো করে ছুঁয়ে দিব। তুমি সেই সূর্যের উষ্ণতর স্পর্শের প্রেমে পরে যাবে। যদি জানতে চাও কতটা ভালোবাসি, তবে আমি নির্বোধের মত তোমার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবো না, নাহ তাকিয়েও থাকতে পারবো নাহ, যতবার তোমায় দেখেছি শুধু তোমাকেই অনুভব করেছি। আমি তোমার অস্তিত্বে মুগ্ধ হয়েছি, তোমার স্নিগ্ধ চাহনিতে মুগ্ধ হওয়ার সাহস আমার হয় নি। আমি তোমার অস্তিত্বকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। নীরা, আমি তোমার মনমোহনের পদ্ম হতে চাই। তুমি আমার অসমাপ্ত কাব্য। যদি এখনো তোমার আমার উপর প্রেম না নামে, তবে তোমার জন্য আমার লিখা কাব্যের প্রতিটি লাইন নিশ্চিহ্ন করে দিব। শুনো বালিকা, ভালোবাসা একবারই আসে, প্রবীণকালে যেন স্ট্রেচারে শুয়ে আক্ষেপ করতে না হয়, ভালোবাসা এসেছিল বটে...।"
এরপর বেশকিছুদিন চলে গেল। অভ্র এখনো নীরাকে ঐ চিঠিটি দেই নি।
২৯ই জানুয়ারি, নীরার জন্মদিন। ১২:০১ মিনিটে নীরার বাসার দরজায় কে যেন কলিংবেল বাজালো। দরজা খুলে নীরা রীতিমত অবাক! দরজার সামনে একটি গিফট বক্স রাখা। তবে অনেক খুঁজেও কাউকে দেখলো না সে। বাক্সের উপরে একটি রজনীগন্ধা ফুলের স্টিক। নীরা ঘরে ঢুকে বাক্সটি খুলে অবাক হয়ে গেল। বাক্সের ভিতরে একটি নীল শাড়ি, আর কিছু লাল-নীল রেশমি চুড়ি আর হাতে আঁকা তার একটি খোলাচুলের ছবি ফ্রেম বাঁধা। আর তার নিচে অভ্রের লিখা সেই চিঠিটি।
১ সপ্তাহ, ২ সপ্তাহ চলে গেলো কিন্তু অভ্র নীরার কাছ থেকে কোনো চিঠি পাই নি আর। ক্যাম্পাসেও নীরার কোনো খোঁজ নেই। তবে ২ দিন পর ছিলো অভ্রের জন্মদিন। তা সে নীরার চিন্তাই ভুলেই গেছে।
অভ্রের জন্মদিনের দিন খুব সকালে অভ্রের নামে একটি চিঠি এল নীলখামে। নীল খাম খুলে চিঠিটা বের করতেই অভ্র দেখল তাতে লিখা, ‘জীবনের যত ভুল করব, সব ভুলের ক্ষমা তোমাকে করতে হবে, হুম তোমাকেই। এই পাগলীটা সারাজীবন তোমার পাশে থাকার সুযোগটি চাই।
ইতি,
তোমার অসমাপ্ত কাব্যের নীরা।'
অভ্র চিঠিটা পড়ার পর খুশিতে কি করবে বুঝে উঠতে পারছিলো না। সে দৌড়ে ক্যাম্পাসে গেল, গিয়ে দেখে পুরো ক্যাম্পাস খালি, শুধু নীরা ক্যাম্পাসের বারান্দায় বসে আছে। অভ্রের দেওয়া নীলশাড়ি, কপালে টিপ, হাতে রেশমি চুড়ি ও কানের উপরের চুলের মধ্যে রজনীগন্ধা ফুল গুঁজে দেওয়া।
অভ্র চিৎকার দিল, ‘নীরা!!!'। অভ্রের দিকে নীরা তাকিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলতে লাগল, ‘প্রবীণ বয়সে এই বলে যেন আক্ষেপে না থাকি, ভালোবাসা এসেছিল বটে....তাই আজ বলছি, “ভালোবাসি"।'
-
লিখেছেনঃ কামরুল ইসলাম তানিম।


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 Comments: