গল্প নং: (০৫)
নামঃ মায়ের মন।
-
---- কনিকার মাম, তুমি একটু অপেক্ষা করো প্লিজ। তোমার সাথে কথা আছে...
মিসেস রেবেকা রোও এর মুখে একথা শুনে আমি বেশ টেনশনে পরে গেলাম। আমার শান্ত-শিষ্ট মেয়ে কনিকা কি ক্লাসে কোন অন্যায় বা দুষ্টুমি করেছে নাকি! কি অন্যায় করতে পারে- কি অন্যায় করতে পারে... ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে গেলাম...
এটা দুই বছর আগের ঘটনা। বার্মিংহ্যাম, ইংল্যান্ডের একটি প্রাইমারি স্কুলের ক্লাস টু- এর দরজার সামনে দাড়িয়ে আছি। স্কুল ছুটি হয়েছে দুপুর ০৩ঃ২০মিনিটে। এখানকার নিয়ম হলো স্কুল ছুটির সময় হলে স্কুলের মেইন গেইট খুলে দেয়া হয়। তখন সব অভিভাবক ভিতরে ঢুকে যার যার বাচ্চার ক্লাসের সামনে গিয়ে দাড়ান। ক্লাস টীচার নিজে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের কে যার যার অভিভাবক এর কাছে দিয়ে দেন।
আমাকে অপেক্ষায় রেখে বাকি ছাত্র-ছাত্রীদের এক এক করে তাদের অভিভাবক এর কাছে তুলে দিতে লাগলেন কনিকার ক্লাস টীচার মিসেস রোও। আর আমি এক পাশে সরে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম-- কনিকা কি কারো সাথে মারামারি করেছে? টীচারের সাথে বেয়াদবি করেছে? পড়া পারেনি? কি হতে পারে? মিসেস রোও কি কথা বলবেন, ভাবতে ভাবতে শীতের মধ্যেও আমি ঘামাতে লাগলাম। -- একেই বলে মায়ের মন। সন্তানের চিন্তায় সব সময় অস্থির!
একে একে সবাইকে বিদায় জানিয়ে এই বার মিসেস রোও আমাকে ভিতরে ডাকলেন। তখনও আমি টেনশনে আছি। আমাকে বসতে বলে কনিকার ইংলিশ সাবজেক্ট এর খাতাটা নিয়ে আসলেন। আমি এবার নিশ্চিত হলাম, নিশ্চয় লেখায় অনেক বেশি ভুল করেছে।
কিন্তু আমার ভাবনাকে ভুল প্রমানিত করে হাসি মুখে তিনি বলে উঠলেন--
-------দেখো তোমার মেয়ে কি সুন্দর লিখেছে! ওর কল্পনা শক্তি দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি।
বলে খাতাটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী ওদের খাতাগুলো সব স্কুলেই থাকতো। ওদের সেদিন যেই টপিক ছিলো, সেটা পড়ানোর পরে মিসেস রোও বলেছিলেন, বাচ্চারা যেন সেই স্টোরি টা নিজেদের মতো করে লেখে। তখন সবাই সেই চরিত্রগুলো দিয়ে নিজেদের মতো করে লিখেছে। আর কনিকার লেখা টা তার কাছে এতো ভালো লেগেছে যে, তিনি আমাকে সেটা না দেখিয়ে পারেননি। তিনি আরো বলতে লাগলেন...
---- কনিকার লেখাতে সব সময় নতুন কিছু থাকে। সব সময় ওর খাতাটা যখন আমি দেখতে নেই, তখন আমি খুব এক্সাইটেড থাকি, কারন আমি জানি-- ওর খাতায় নতুন আর ভালো কিছু পাবো....
ক্লাস টীচার মিসেস রোও এর কথা শুনতে শুনতে কনিকার লেখা পড়ছিলাম... কিন্তু ভীষণ অবাক হয়ে দেখলাম আমি লেখাগুলো পড়তে পারছি না। লেখাগুলো বার বার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ভীন দেশে - ভীন দেশী একজন শিক্ষিকার মুখে নিজের মেয়ের প্রশংসা শুনে বার বার চোখ দু'টো ভিজে যাচ্ছিলো।
ঠিক তখনই আমি আবারো অনুধাবন করতে পারলাম যে, সন্তানের সামান্যতম সাফল্যেও মায়ের মন কতোটা আনন্দিত হয়! একেই বলে মায়ের মন !!
-
লিখেছেনঃ তানিয়া সুলতানা রিমা।



0 Comments: