গল্প নং:- (০১)
গল্প নামঃ দুষ্ট-মিষ্টি বন্ধুত্ব।
-
রিলেশন ব্রেকাপের পর যখন মাহিয়ার আর বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছেই নতুন করে জন্মাচ্ছিল না , তখন সে সুইসাইড করে নেওয়ার পণ নিয়ে ফেলে। কাঁপতে কাঁপতে হাতে ব্লেড নিয়ে হাতের কব্জি কেটে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন হঠাৎ দরজার সামনে আমাকে দেখে আর সাহস এগিয়ে নিতে পারলো না। ব্লেডটা হাত থেকে ফেলে হাউমাউ করে কেঁদে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি জানতাম ওর মত মেয়ে সুইসাইড করার কথা স্বপ্নেও আনতে পারবে না কিন্তু বুকের বাঁ পাশে প্রতিনিয়ত ভয়ের শঙ্কা বাজছিল যদি কিছু করে ফেলে!
তাই ছুটে আসলাম।
..
এরকম পরিস্থিতিতে তাকে সান্ত্বনা দেবার বদলে আমার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। সুইসাইডের জন্য না আবার। সে সুইসাইড জীবনেও করতে পারবেনা। যে মেয়ে একটু আঘাত সইতে পারেনা সে কিভাবে কব্জি কাঁটার পর রক্ত দেখে ঠিক থাকবে!
..
আমার রাগ মূলত আমার নিজের ওপর। আমিই ওকে খারাপ সঙ্গ থেকে দূরে রাখতে পারিনি। দূরে রাখা তো দূর, আমি এটাও জানতাম না যে আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড আমার অগোচরে অন্যকারোর সাথে রিলেশন করছে। সে কত দানা ভাত মুখে দিত এটাও আমাকে গুনে গুনে বলতো কিন্তু রিলেশনের মত এত বড় কথা আমাকে জানায়নি।
যদি আমি মানা করি দিতাম!
..
আমি বহুদিন কথার ফাঁকে ফাঁকে রিলেশনশিপ নিয়ে লাভ-ক্ষতির অংক কষতাম আর তাকে বুঝাতাম। আমি বারবার জোর গলায় বলতাম রিলেশন না করতে। কিন্তু সে আমার লাভ-ক্ষতির অংক উপেক্ষা করে ভদ্রবেশী এক বখাটের সাথে রিলেশনে জড়িয়ে পরে। যদি শুধু রিলেশনে জড়িয়ে থাকতো, তাহলে মোটামুটি সীমার মধ্যে রাখতাম, কিন্তু সে ফিজিক্যাল রিলেশনেও এগিয়ে গেল। সাতমাস ধরে প্রেম চলছিল তাদের কিন্তু আমি কোনরকম গুণাভাস পাইনি। ভেজা চুলায় যখন মোটামুটি আগুনের ফুলকি দেখতে পেলাম তখন সোজাসুজি আমি তাকে ধরে ফেললাম। কিন্তু একটু বেশি দেরী করে ফেলেছিলাম।
..
গত কয়েকদিন ধরে মাহিয়ার আচরণে অনেক নিস্তব্ধতার আর্তনাদ শুনতে পেলাম। আমার মেসেজের কোন রিপ্লাই দেয় না, কলও রিসিভ করেনা। নইলে অন্যান্য দিনগুলোতে ওর কল মেসেজের যন্ত্রণায় আমি অতিষ্ঠ হয়ে যেতাম।
ওর মামার কাছ থেকে জানলাম সে খাওয়া-দাওয়া গোসল সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে। কথাটা শুনে আমার কাছে অনশনের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি লাগছিল।
আগুনের ফুলকি তখন আরো কিছুটা জ্বলে উঠলো।
..
আমি এসে দেখলাম সে বদ্ধ রুমের মধ্যেই জীর্ণ হয়ে বসে আছে। মামার সামনে ভয়ে আমাকে কিছু বলতে পারছেনা। কিন্তু মামা যেতেই ও সব আমাকে খুলে বললো। ছেলেটা সেইদিন লুকিয়ে সবকিছু ভিডিও করেছে আর এখন সে মোটা অংকের টাকা চাচ্ছে। কিভাবে সে এত টাকা দিবে আর মামা যদি জানতে পারে তাহলে ওর কি নাজেহাল অবস্থা হবে সেই ভয়ে রুম থেকেই বের হচ্ছিল না।
..
যাক, দেরীতে হলেও সবকিছু জানতে পারলাম। সবকিছু স্পষ্ট পরিষ্কার হল। তখন আমি তাকে সলুশন দেওয়ার মত কিছু বলতে পারলাম না। শুধু বললাম আমাকে কিছু সময় দে, আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি। প্রথমে তার চেহারা দেখে বুঝতে পারছিলাম না কিন্তু শেষে হাসি দিয়ে বুঝালো আমার ওপর আস্থা আছে।
..
দুদিন ধরে মেয়েটা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করেনি। আমি তাকে ভাত খাইয়ে দিলাম। এর আগে অনেকদিন আমি তাকে এভাবে ভাত খাইয়ে দিতাম। দু-দিন পর পর সে বায়না ধরত আমি যেন এসে তাকে খাইয়ে দিই। আর আমিও যেকোন দরকারি কাজ ফেলে এসে ওকে ভাত খাইয়ে দিতাম। ওর রাগও ভীষণ বেশি। যদি একটু দেরী করে ফেলি তাহলে আর খাবেই না। ছোটবেলায় মা-বাবাকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছিল। মামা একজন আছে যে সারাদিন ব্যবসায় ডুবে থাকেন। কারো সাথে যে মন খুলে কথা বলবে তাও তার ভাগ্যে ছিল না। তারপর তার জীবনে আমি আসলাম। সেইদিন থেকে সে আর একটা সেকেন্ডের জন্য মুখ থেকে হাসি আড়াল করেনি।
তাকে খাইয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে আমি বাসায় চলে আসলাম।
..
বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে ভাবতে লাগলাম কিভাবে ছেলেটাকে আটকানো যায়! আর যদি আটকাতে না পারি তাহলে এতগুলো টাকা কিভাবে সংগ্রহ করবো!
মাথা কাজ করছিল না, হ্যাং করছে। পরীক্ষায় ফেল করার পর এতটা টেনশন করিনি ভবিষ্যতের জন্য হায় আমি বাকী জীবনে কি করবো! দুবেলা আলু-মাংস দিয়ে ভাত না খেলে শরীর যে চুপসে যাবে সেটা নিয়েও একফোঁটা টেনশন করতাম না। কিন্তু মাহির (মাহিয়া, সংক্ষেপে মাহি বলে ডাকি) সব ছোট ছোট সমস্যাগুলোতে আমি কেমন জানি অস্থির হয়ে যাই।
বছরখানেক আগে একবার বলেছিল ওর চুল পরে যাচ্ছে। আমি নেটে সার্চ করে জানতে পারি একটা ওষুধিপাতা আছে যেটা লাগালে চুল পরা বন্ধ হয়। বাসা থেকে পঁয়ষট্টি মাইল দূরে একটা জঙলে গিয়ে গাছে উঠে ওর জন্য পাতা এনেছি যেখানে আমি সামান্য হাঁটা চলায় অসুস্থ হয়ে পরতাম।
আমি একবার তাকে একটা নূপুর কিনে দিয়েছিলাম। ওর খুব ভালো লেগেছিল এটা। কিন্তু একদিন পছন্দের নূপুরটা পুকুরে পরে গিয়েছিল। তার কান্না দেখে আমি সহ্য করতে না পেরে সারা পুকুর তোলপাড় করে নূপুর বের করে দিয়েছিলাম। এরপর চারদিন আমি বিছানা থেকে উঠতে পারিনি অসুস্থতার জন্য। তারপর থেকে আমি ওকে যা যা কিনে দিতাম সবকটার এক্সট্রা জিনিস আলাদা করে কিনে রাখতাম।
এরকম ওর আরো অনেক ছোট ছোট সমস্যাদি আমি উদ্ভট ভাবে সমাধান করেছি।
কিন্তু বর্তমানেরটা জটিলের চেয়েও বেশ জটিল ছিল।
..
দুইদিন চলে গেল, কিছুই করতে পারলাম না। এরই মধ্যে ওর সুইসাইড এটেম্পট আমাকে আরো টেনশনে ফেলে দিল। অগত্যা কোন উপায়ন্তর না দেখে বাইক কেনার জন্য যতটাকা জমিয়েছি সব টাকা ব্লেকমেলারের হাতে তুলে দিলাম আর সব ক্লিপগুলো ডিলিট করে দিলাম। টাকা কোথায় থেকে এসেছে কিভাবে দিয়েছি সেটা আর মাহিকে জানালাম না। সে বারবার জানতে চেয়েছিল কিন্তু আমি তাকে জানায়নি। বাইক কিনতে না পারার আফসোস মিটিয়ে নিলাম ওর মুখের এক চিলতে হাসি দেখে। প্রথম প্রথম কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু শেষে মানিয়ে নিয়েছি। মাহি
যখন হাসে, ওর গালদুটো গোলাপের পাপড়ির মত ফুলে যায়। হাল্কা গাঢ়রূপ গালে ওর হাসিটা যেন বিষাদিনী বিষ সব শুষে নেয়। ধমকা বাতাসের ঝাপটায় ওর চুলগুলো আমার সারা রাজ্যে প্রশান্তি নিয়ে আসে।
..
আস্তে আস্তে আগের মত সবকিছু ঠিক-ঠাক হল। পড়ন্ত বিকেলের পার্কে হাঁটা, সন্ধ্যের সোডিয়ামের আলোর নিচে ফুসকা খাওয়া, রাতের জোনাক আলোর নিচে শতরাজ্যের কাব্যাদিতে শ-রাত কাটিয়ে দিতাম।
..
আমাদের ফ্রেন্ডশিপ নয় বছরে পদার্পণ করলো। এই নয় বছরের একটা দিনও মিস হয়নাই যে আমি তাকে ভালোবাসি বলিনি। কিন্তু সে কোনদিনও ভালোবাসির উত্তরটা দেয়নি। কিভাবে উত্তর দিবে সে! কোনদিন নিজের কানে শুনেছে আমি তাকে ভালোবাসি বলেছি! আমি তো ঘুটঘুটে অন্ধকার রুমে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ছবি দেখে ভালোবাসি বলি। শুধু ভালোবাসি বলি তা না, মনের ভেতর অজস্র না বলা যত কথা আছে, প্রতিটা রাতে সব কথা ওর ছবি দেখে গুনগুন করে গেয়ে যেতাম।
..
এক তরফা ভালোবাসার মজাই আলাদা। তেলেগু ভাষার সিনেমা বিনা সাবটাইটেলে যেমন হয় সেরকম। না বুঝা যায় সুখ কিরকম, না বুঝা যায় দুঃখ কিরকম। শুধু নিয়মের মত চলে যেভাবে আমি চলছি।
..
ধীরে ধীরে আমরা বড় হলাম। সময়ের সাথে সাথে আমাদের দূরত্বও বাড়তে থাকলো। আমি পড়াশোনার জন্য অন্য সিটিতে শিফট করি। মাসের পর মাস যায় আমি তাকে ভাত খাইয়ে দিই না, ঘুম পাড়িয়ে দিই না। তার অঢেল খুনসুটি বায়নাগুলোও দূরত্বগুলোকে বেছে নিল। মাঝে মাঝে আমাদের কথা হত কিন্তু আমি সময় করতে পারতাম না। দূরত্ব সীমা-পরিসীমা ছাড়িয়ে গেল।
..
একদিন তার কল আসলো। আমার সেদিন গুরুত্বপূর্ণ একটা ইন্টার্ভিউ ছিল। আমি যথাসময়ে ব্যাক করতে পারিনি। রাতে ফ্রি হয়ে কল দিলাম। কিন্তু কোনদিনও ভাবিনি সেই রাতটা আমার জন্য কালরাত্রি হবে। তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলেটার সাথে তার চারমাসের রিলেশন ছিল। দু-পক্ষ রাজি থাকায় প্রেম পেরিয়ে বিয়েরডালা সাজিয়ে ফেলা হল। আমাকে দাওয়াত পাঠালো। বিয়ের এক সপ্তাহ আগে যেন আমি থাকি। বিয়ের সব দায়িত্ব আমার।
..
আমি ভেঙে গেলাম, পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলাম। যে হ্নদয়টাতে তাকে রেখেছিলাম সেটা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল। এভাবে কেউ আমাকে ধুমড়ে-মোচড়ে দিবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
..
রিলেশনের লাভ-ক্ষতির হিসেবে এভাবে গণ্ডগোল পাকবে তা আমি আঁচও করতে পারলাম না। এখন চালে-ডালে টের পেলাম কয়েকবছর আগে মাহি কেন ব্লেড হাতে নিয়েছিল। আমার জীবন তো এখানে থেমে থাকার কথা না, তাহলে এখানে থামলো কেন!
..
বিয়ের ডেইট ঘনিয়ে আসলো। যে ইন্টার্ভিউ দিয়েছিলাম সেটার রেজাল্ট হাতে পেলাম। অস্ট্রেলিয়ায় জব পেয়ে গেলাম। অবশেষে জীর্ণশীর্ণ জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট খুজে পেলাম। এখানে ধম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। যেদিকে পা দিই সেদিকে মাহিকে দেখি। এইতো এই রাস্তায় ওকে নিয়ে হাঁটতাম, ওই গলির শেষ মাথার দোকানটায় ফুসকা খেতাম। ওই ব্রিজে যানবাহন না থাকলে দু-পা মেলে শুয়ে পরতাম। সবকিছু চোখের সামনে ভাসছিল। কষ্টগুলো আমাকে একদম মেরে ফেলছিল। তাই সব স্মৃতিকে এখানেই দাফন করে মাহিকে না জানিয়ে চলে গেলাম।
..
দেখতে দেখতে তিনটা বছরের ক্যালেন্ডারের পাতা শেষ হয়ে গেল। এই তিন বছরে আমি একবারও মাহির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করিনি। হয়তোবা সে চেষ্টা করেছিল কিন্তু জানেনা আমি কোথায়। নতুবা চেষ্টা নাও করতে পারে। কেননা বিয়েতে তো আর যাইনি রাগও করেছে। আর কোথায় এসেছি তাও তো জানাইনি। মাঝেমধ্যে ওর কথা মনে পরে কিন্তু কাজের তালবাহানায় সবকিছু চাপিয়ে রাখি। কি দরকার কষ্টটাকে তীব্র করার!
..
জানিনা সে এখন কেমন আছে! কোথায় আছে! স্বামীর সঙ্গে হয়ত সুখের সংসার বুনছে। এতদিনে হয়ত তার কোলজোড়ে সন্তানও এসেছে। এক-দু বাচ্চার মাকে এখন দেখতে কিরকম লাগবে? চঞ্চল তো মোটেই থাকবে না, সংসার চালাচ্ছে যখন সংসারীর মতই লাগবে। শাড়ি-টাড়ি কি পরে! নাকি পরতে গিয়ে প্যাঁচ লাগিয়ে বারোটা বাজিয়ে ফেলে! আমি কতবার তাকে বলেছিলাম শাড়ি ভালো করে পরতে। কিন্তু যে জিনিসটার প্রতি তার অনীহা সেটা হাজারবার বললেও কানে ঢুকবে না। ছোট্ট মনে কোটি-কোটি প্রশ্ন তাকে ঘিরে। কিন্তু উত্তরের জন্য তার অনুপস্থিতি আমাকে হাহাকার করে তুলে।
..
প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে পিওনী নামের একটা বিদেশি ফুল কিনে বাসায় নিয়ে যেতাম। এই ফুলেরগন্ধ এতটা ঘ্রাণেন্দ্রিয় যে আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়প্রবণ প্রেমের আমেজ রাঙিয়ে তুলে। প্রথম যখন এদেশে আসি সর্বপ্রথম এই ফুলটাতে আমার নজর কাড়ে। দেখা মাত্রই গুনগুনিয়ে বললাম ইশশ মাহিকে যদি এই ফুলেরতোড়া দিতাম তাহলে সে অনেক খুশি হত। যেহেতু এই ফুল দেখে ভালো লাগলো তাই প্রতিদিন এটা বাসায় নিয়ে যেতাম আর রুমে রাখতাম। যদিও এতে কোন লাভ হত না তবে ভালোলাগার বিষয়টাতে আমি কৃপণতার সুযোগ দিচ্ছিনা।
.
প্রত্যেকদিনের ন্যায় আজও ফুলেরতোড়া কিনতে স্টলের সামনে এলাম। এখানে শ-জাতের ফুলের সুভাস বেরোচ্ছে। কিন্তু একটা সুভাস অনেক পরিচিত মনে হচ্ছে। অনেককাল ধরে যেন এই সুভাসটাকে মিস করছি। একটা জিনিস বুঝতে পারলাম না এতকিছুর সুভাসের আড়ালে এই সুভাসটাই কেন নাকে আসছে! হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজনের মেয়েলি কন্ঠ শুনতে পেলাম। পেছনে তাকাতেই আমার চোখ দাঁড়িয়ে গেল। আমি একি দেখছি! স্বপ্ন নয়তো! গায়ে নীল শাড়ি, হাতে নীল চুঁড়ি, কপালে নীল টিপ, অদম্য খোলা চুলে মাহি দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রতুষার আকাশে রাতের কল্পনায় আমি তাকে ঠিক এরকমই স্বপ্নে দেখতাম। কিন্ত সে এখানে কি করে? কিভাবে জানলো আমি এখানে? আবার আমার পেছনেই? উত্তরের চেয়ে আমি অবাক বেশি। কোনটা আগে জানবো তার হদিস মিলাতে পারছিনা।
..
আজ বহু বছর ওর কন্ঠ শুনলাম। ঠিক একিরকম সাজে সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে জিজ্ঞেস করলো;
..
--কি অবস্থা রে হারামীর হারামী?
আগেও সে আমাকে এরকম জিজ্ঞেস করতো, ঠিক একি সুরে, একি গলায়, একি ভঙ্গিতে। আমি জবাব দিলাম;
--হ্যা ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
যদিও তুমিতে অস্বস্তিবোধ করছি তবুও আগেরমত তুইতে যেতে পারবো না।
--আমি তো মনে করেছি তুই আপনিতে কথা বলবি। হ্যা ভালো আছি।
--তুমি কিভাবে জানলে আমি এখানে?
--না বলে চলে গিয়েছিলি এজন্যই নাকি আমি তোকে খুজতে চলে আসবো?
--না মানে! আসলে!..........
--থাক থাক, আর কষ্ট করে মিথ্যে বাহানা বানাস না।
--হুম, আচ্ছা।
--কি করোস? ফুল কার জন্য? বউয়ের জন্য নাকি?
--আমি বিয়ে করিনি।
--তাহলে গার্লফ্রেন্ড? তুই না প্রেমে বিশ্বাস করতি না?
--গার্লফ্রেন্ডও নেই।
--তাহলে কার জন্য?
--রুমে ফ্রেগ্নেন্সের জন্য।
--তুই আগের মতই জটিল রয়েছিস। রুম স্প্রে থাকতে ফুল ইউজ করিস কেন?
--যেভাবে ভালো লাগে সেভাবে।
--নাকি কাউকে এই ফুলে মানাবে এজন্য রুমে নিয়ে যাস?
..
উপ্স! সে কিভাবে জানলো এটা? আমি তো কোন ডায়রী লিখিনি যে সেখান থেকে পড়বে! বেশি ভাবলাম না, পরে বলবে মিথ্যে বাহানা খুজছি।
..
--আরেহ না না এরকম কেউ নেই।
--না থাকলেই ভালো। তো বিয়ে-শাদি করোস নাই কেন?
--এমনি।
--এমনি আবার কিরকম বাহানা? সত্যি করে বল,
--মনের মত পেয়ে গেলে বিয়ে করে নিবো।
--দুয়া করি যেন তাড়াতাড়ি পেয়ে যাস।
--তা, স্বামীর সাথে এখানে এসেছো নাকি?
--হ্যা, তো কে নিয়ে আসবে?
--না, ঠিক আছে। আর বাচ্চারা? মেয়ে না ছেলে?
--আমার সন্তান নেই।
--ওহ। তা স্বামী কোথায়?
--তুই এত জ্বামাই জ্বামাই করছিস কেন?
--না, দেখতাম শুধু,
--তো বিয়েতে আসিসনি কেন?
--এর আগেই এখানে চলে এসেছিলাম।
--আমাকে না জানিয়ে আসতে পারলি?
--সরি।
--একবারও কি আমার খোজ নেয়ার চেষ্টা করিস নি?
--ব্যস্ত থাকি সবসময়।
--তো, প্রতিদিন এখান থেকে ফুল নিয়ে যাওয়া কি ব্যস্ততায় পরে না?
--তুমি কিভাবে জানলে আমি এখানে প্রতিদিন আসি?
--তোকে কয়েকদিন ধরে ফলো করছি। তোর বাসার এড্রেসও জানি। 29 Greenland park……………।
--হয়েছে হয়েছে। তো এতদিন ফলো করলে কেন? সামনে আসলেই পারতে।
--আজকের জন্য অপেক্ষা করছি।
--আজকে কি?
--তোর জন্মদিন রে গাধা।
আমার মাথায়ই ছিল না আমার জন্মদিন আজকে। লাস্ট তিন বছর ধরে আমি একবারের জন্যও মনে করিনি আমার জন্মদিনের কথা। আমি আগেও কোনদিন আমার জন্মদিনের কথা মনে রাখতে পারতাম না। সে প্রত্যেকবার মনে করিয়ে দিত। আজও মনে করিয়ে দিল।
--তুই এখনো তোর জন্মদিনের কথা মনে রাখতে পারোস না?
--কি দরকার এসবের? শুধু শুধু সময় নষ্ট না!
--অনেক বড় হয়ে গেছিস রে তুই।
--হুম জানি।
--তা তোর জন্য আমি একটা সারপ্রাইজ প্লান করেছি। তুই নিয়ে যাবি আমাকে? তোর বাসায়!
--সারপ্রাইজ প্লান? আমার বাসায়! মানে?
--আগে যেভাবে তোকে জন্মদিনের সারপ্রাইজ দিতাম সেভাবে। তুই কোন নাহ-নো করবিনা। চল.
..
আমিও আর কথা বাড়ালাম না। এতদিন পর ওকে দেখতে পেয়েছি আর সে যখন বাসায় যেতে চাচ্ছে তাহলে না করার কি দরকার! আমি স্বপ্নেও ভাবিনি এজীবনে আমি সচক্ষে মাহিকে দেখতে পাবো। গাড়ি ড্রাইভ করছিলাম। নয়ত বারবার দাঁতে কামড় খেয়ে দেখতাম এটা স্বপ্ন না তো!
আড়চোখে বারবার তাকে দেখছি। যখনই চোখে চোখে নজর পরে যায় আমি লজ্জা পেয়ে যাই। কিন্তু তাকে বুঝতে দিচ্ছিনা। বাইরের দিকে তাকিয়ে বলি ওটা জনসনের ঘর, ওটা ডেভিডের ঘর। সে হ্যাঁ হ্যাঁ বলে জবাব দিচ্ছে আর মুচকি হাসছে।
একি! সে হাসছে কেন! তাহলে কি আমি ধরা খেয়ে গেলাম!
ইশশ!!........
..
গাড়ি থেকে নামলাম। বাসার উলটোদিকে যে পার্কটা আছে সেটা আজ অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। মনে হয় আজকে ওইখানে কোন বড় ধরনের পার্টি আছে। আমি মাহিকে বাসায় নিয়ে গেলাম। তাকে কফির অর্ডার করলাম সে উলটো আমাকে ধমক দিয়ে বললো যা তো ফ্রেশ হয়ে নে। আমি বরাবরের মত ওর কথা শুনে গেলাম।
..
শাওয়ার অন করে দাঁড়িয়ে আছি। হাতটা ওয়ালে ধরে বুকে হাত দিলাম। আজ অনেকদিন পর বুকের ব্যথা কম মনে হচ্ছে। শান্তিতে নিশ্বাসও ফেলতে পারছি। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখি আমার চোখ-মুখে অন্যরকম হাসি যে হাসিটা আগে সবসময় আমার মুখে লেপ্টে থাকতো। কারণটা তো অবশ্যই সে। সে ছাড়া যে আমি নির্লিপ্ত সেটা আমি অনেক আগেই বুঝেছি।
..
ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। মাহিকে ডাক দিলাম, সে কোন জবাব দিল না। সারা বাসা তন্নতন্ন করে খুজলাম, পেলাম না। সে চলে গেল নাকি!!
ফোনটা বের করে কল দিবো, হঠাৎ মনে পরলো ওর তো নাম্বারই রাখা হয়নি। বিষণ্ণ হয়ে বেডরুমে আসলাম। খেয়াল করলাম সাদা বেডসিটের ওপর কিছু রাখা আছে। দেখি একটা নীল রঙের স্যুট বিছানার ওপর রাখা। স্যুটের উপর একটা চিরকুটও। স্যুটটার দিকে আর নজর দিলাম না, চিরকুট হাতে নিলাম। লিখা ছিল ,"এই স্যুটটা আমি তোর জন্য কিনেছি। এটা পরে বাইরে আয়। আমি অপেক্ষা করছি।"
..
অবশেষে বুকে জান ফিরে পেলাম। তখন আমি প্রথমবার স্যুটের দিকে তাকালাম। আমি মনে করেছি আমার কোন স্যুট আলমারি থেকে বের করে রেখেছে।
..
যাক! মেয়েটার পছন্দটাও আমার ঘুটঘুটে অন্ধকারের স্বপ্নের মত মিল ছিল। আমারও অনেক ইচ্ছে ছিল আমি নীল স্যুট পরে মাহি নীল শাড়ি পরে নীল নীলাম্বরে হারিয়ে যেতে। এক আকাশের নিচে দুইটা নীলাভ পাখি ডানা মেলে উড়বে, ভালোবাসায় নিজেদেরকে বিলিয়ে দিবে এক অজানা শুভ্রমৌলিতে। এরকমই ছিল আমার ধূসর স্বপ্নজাল। কিন্তু এই ধূসরতায় কেন যে রঙধনুর সাতটা রঙের আভাস সোনালি গোধূলিতে ভেসে যাচ্ছে বুঝতে পারছিনা।
আসলেই কি সাতটা রঙ দেখা যাবে! কিভাবে? রঙধনু কিরকম! মাহি নয়তো সেই রঙধনু! নাহ! মাহি কিভাবে হবে! ওর স্বামী আছে।
তাহলে কি আমি ভুল ভাবছি!
নাহ! ভুল তো হবে না। আমি স্পষ্ট ইঙ্গিত পাচ্ছি আমার ভেতরে অন্যরকম এক সুখেরকাঁটা আমাকে তছনছ করছে।
..
ভাবতে ভাবতে রেডী হয়ে গেলাম। দরজা খুলতেই দেখি নিচে বড় একটা মাদুর বিছানো। দেখলাম আমার দরজার সিঁড়ি থেকে পার্কের গেইট পর্যন্ত এই মাদুরীয় মাধুর বিছানো। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। আর এক পাও এগুলাম না। পার্কের মাদুর আমার দরজার সামনে কেন! কে লাগালো!
তখন হঠাৎ মাহি ডাক দিল। বললো এই মাদুরের ওপর যেন হেঁটে আসি। আমি কিছু সময়ের জন্য নির্বাক হয়ে গেলাম। পার্কের মাদুরের সাথে আমার সম্পর্ক কি! মাহি জোরে একটা ধমক দিল। আমি ভাবনাটাকে এখানে স্টপ করে হাঁটা শুরু করলাম।
..
ধীরে ধীরে পার্কের গেইটের সামনে গেলাম। সব দিকে আমার নামের প্লেকার্ড লাগানো। সরি দোস্ত, মিস ইউ হারামী এগুলো টাইপের। পার্কে অনেক বেলুন লাগিয়েছে। সবটা লাভ শেইপের। আচ্ছা, তাহলে কি পার্কটা সে ডেকোরেশন করেছে!! তাও আমার জন্য!!
সে আমার হাত ধরে ভেতরে ঢুকালো। এতবছর পর আবার ওর হাতের স্পর্শ পেয়ে সেই আগের ফিলিংস চলে আসলো। আমি ওর দিকে তাকিয়েই রইলাম। সে সামনের দিকে তাকাচ্ছে। আমি সামনে তাকালাম দেখি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! দেখলাম বড় একটা কেক টেবিলের ওপর রাখা। কেকের ওপর লেখা ছিল "হ্যাপি বার্থডে আমার হারামীটা"।
আগেরবারের মত ঠিক একিরকম উইশ করলো। মেয়েটা এখনো কিছু ভুলেনি। আমিও তো কিছু ভুলিনি।
..
ওর হাতটা ধরেই কেক কাটলাম। আগে ঠিক যেরকম মজা করে হেসে হেসে কেক কাটতাম আজও ঠিক সেরকম কাটলাম। আমি অজান্তেই কেক কেটে তাকে খাইয়ে দিলাম আর অল্প কেক ওর গালে লাগালাম। আমি তখন একটুও হুশে ছিলাম না। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আমার সাথে ওর দূরত্বের কথা, ওর স্বামীর কথা। সেও আমার গালে কেক লাগিয়ে দিল। হঠাৎ দেখলাম তার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। আমি খেয়াল করলাম সেটা। তার চোখের কোণে জল। পৃথিবীর সব জিনিস আমি সহ্য করতে পারি শুধু ওর চোখে জল সেটা আমি জীবনেও সহ্য করতে পারবোনা। আমি আর নিজের নতুন পার্সোনালিটিকে আগলে রাখতে পারলাম না। সেই আগের রূপে আগের ভাষায় আগের ভঙ্গিমায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম;
--মাহি! কি হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন!
..
--আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি রে।
--কি ভুল করেছিস?
--তুই যে স্বামীর কথা বারবার বলছিস সে স্বামী কোন স্বামীর জাতই না, নরপিশাচ একটা। আমি তাকে ভালো মনে করেছিলাম। কিন্তু তার আসল রূপটা আমি বিয়ের পর জানতে পারি। এর আগে সে দুইটা বিয়ে করেছে। বিয়ের পর বউকে ঘরে রেখে সে অন্য জায়গায় মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করতো। একদিন তার এক বন্ধুর কল আসছিল। সে তখন ঘুমাচ্ছিল। আমি কল রিসিভ করতে ওপাশ থেকে ছেলেটা বললো; "তোর বউকে কবে আনবি! শালা আমাদের বউকে নিয়ে তো ভালোই এঞ্জয় করেছিস। এবার আমাদেরও করতে দে। কালকে একটা জবরদস্ত পার্টি আছে। তোর বউকে নিয়ে আসিস কিন্তু।"
আমি কল কেটে দিলাম। আমার মাথায় যেন বজ্রপাত পরলো। আমি নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আমি যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি সে এরকম নোংরা চরিত্রের হবে!
সে ঘুম থেকে উঠলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, প্রথম প্রথম অস্বীকার করলেও পরে করেনি। আমাকে মারধর করে আমাকে রুমে বন্ধী করে রাখে। তারপর যখন জানতে পারলাম সে আজকে তার বন্ধুদের নিয়ে এসে আমার ইজ্জত নিলামে তুলবে আমি আর একমুহুর্ত দেরী না করে সেখান থেকে পালিয়ে যাই।
মামাকে গিয়ে সব বললাম। মামাও ইতিমধ্যে সব জেনে গিয়েছিলেন। সে মামাকে ফোন করে হুমকি দিয়েছে আমি যদি ফিরে না আসি তাহলে আমাকে দেখে নিবে। আমি ভয় পেয়ে যাই। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তোকেও খুজে পাচ্ছিলাম না। ওইসময়টাতে তোকে আমার অনেক জরুরি ছিল। তাই অনেক ডিপ্রেশনে পরে গিয়েছিলাম।
তোর মনে আছে একটা ছেলে যে আমাকে ব্লেকমেল করে টাকা খুজেছিল! একদিন তাকে শপিংমলে পেয়েছিলাম। তার কাছ থেকে জানলাম তুই তোর প্রথম বাইক কেনার জমানোর টাকা ওকে দিয়েছিস। বিশ্বাস কর, আমি কেঁদে দিয়েছিলাম এটা শুনে। তুই আমার জন্য এতকিছু করেছিস আর আমি কি করলাম! আমি আরো ভেঙে পরি।
তারপর মামা আমার করুণ অবস্থা দেখে আমাকে কানাডা খালার কাছে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে গিয়েও অস্থিরতা কাটেনি। অবশেষে তোকে খুজতে শুরু করলাম।
..
-- তাহলে আমাকে খুজে পেলি কিভাবে?
..
--মামার এক ফ্রেন্ড, এখানেই থাকেন, নাম চার্লস। মামা উনার সাথে তোর ছবি দেখেছেন। তারপর আমাকে জানালেন। আমি আস্তে আস্তে সব খবর নিলাম। উনি তোর...........।
--আমরা একি কোম্পানিতে ম্যানেজিং ডিরেক্টর।
--হ্যা, তারপর তোর সব বায়োডাটা নিয়ে এখানে চলে আসলাম।
..
আমি ওর কথা শুনে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কি বলবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। হাসবো নাকি কাঁদবো তাও জানিনা। সে বললো;
..
--তুই যতদিন আমার পাশে ছিলি, আমি কোন বিপদে পরতাম না। তুই না থাকলেই আমার সব বিপদ আসে। কেন!
--জানিনা।
..
আমি চাচ্ছিলাম না নিজেকে আর দুর্বল করবো। সে আমার হাতটা ধরে বললো;
..
--সত্যি করে বল,
..
আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না।
..
--তোকে আগলে রাখতাম তাই,
--অন্যকেউ আমাকে আগলে রাখতে পারে না কেন!
--তা আমি কি করে জানবো?
--বিয়ের কথা শুনে তুই চলে এসেছিলি। না?
--না, মানে?
--সত্যি করে বল,
--হ্যা, বিয়ের কথা শুনেই এসেছিলাম। কিন্তু এখন এ বিষয় নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। আমি কয়েকবছর আগে সবকিছু দাফন করে এসেছি।
--কবর থেকে সব তুলে বল, আমি আজকে সব শুনবো। শুনার জন্যই এতদূর এসেছি।
--কি শুনবি আর? শুনার মত কিছু আছে? তুই তো সবকিছুই শেষ করে দিয়েছিস। আমিও সবকিছু দাফন করে দিয়েছি। বলার মত আর কিছু বেঁচে নেই।
--বেঁচে আছে। অল্প হলেও লাশগুলোতে প্রাণ আছে। তুই বল না রে, প্লিজ।
..
বলার সাথে সাথেই সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে লুটিয়ে পরলো। আমি তাকে তোলার চেষ্টা করলাম, সে বাধা দিল। সে বললো;
..
--আমি আর পারবোনা রে, আর পারবোনা তোকে ছাড়া। তুই ছাড়া আমি অচল। মামা ঠিক-ই বলতো, তুই যেরকম আমাকে আগলে রাখতি, যেরকম খেয়াল রাখতি, আর কেউ এরকম পারবেনা। আমি জানি তুই আমাকে ভালোবাসিস, অনেক ভালোবাসিস, এতটাই ভালোবাসিস যে আমাকে ছাড়া তুই একমুহূর্তও থাকতে পারবিনা। আমি জানি, তুই নিজে খাইতে সময় এখনো আমাকে মিস করিস। মনে মনে বলিস না ইশ মাহিকে যদি আবার খাইয়ে দিতে পারতাম!
তুই কি চাস না আমাকে নিজের ছায়ায় রাখতে!
..
আমি ওর কথা শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। আমি এতদিন ধরে যে জিনিসটা মনের মধ্যে পুঁতে রেখেছিলাম সেটা সে এক ঝাটকায় উখড়ে তুলে দিল। সে কথাগুলো বলে কাঁদছে, ঠিক আমিও কাঁদতাম। কিন্তু ওর চেয়ে বেশি। সে এই কয়েকদিনে আমাকে ভালোবেসেছে। কিন্তু আমি তো একযুগ ধরে। আমার কি এতদিনের সব কষ্টের মূল্য শুধুমাত্র চোখের কোণের একফোঁটা জল?
..
নাহ, আর পারবোনা। আমি আর পারবোনা ওকে অপেক্ষা করাতে। নিজেও তো আর অপেক্ষা করতে পারছিনা। কাউকে ভালোবাসলে কি অপেক্ষা করা যায়! না, যায় না।
আমি এটা কি বলছি! আমি নিজে একযুগ ধরে অপেক্ষা করছি আর এখন বলছি অপেক্ষা করা যায় না!
..
একযুগ চলে গেল মাহিকে একতরফা ভালোবেসে। কিন্তু মনে হচ্ছে ১২সেকেন্ড আগেরই কথা। সময় এত তাড়াতাড়ি গেল কিভাবে? কষ্টের সময়গুলো জানতাম বেশিদিন টিকে। কিন্তু আমার তো উলটো মনে হচ্ছে।
আমার কি এতই ধৈর্যক্ষমতা! নাকি এটা ভালোবাসার কোন যোগান!
আমি ওকে দাড় করালাম। আমার হাতে হাত ধরে ওকে বুকের ধারে রাখলাম। সে কেঁদেই চলছে। আবার সহ্য করতে পারছিনা ওর কান্নাগুলো। হুট করেই ওকে বুকে টেনে নিলাম। স্যুটটা ভিজিয়ে দিল তার জলে। সে জিজ্ঞেস করলো;
--আমার কেনা স্যুট, ভিজলে সমস্যা না।
আমি অবাক হয়ে গেলাম। কিভাবে বুঝলো আমি স্যুটের কথা ভাবছি! আমি ওর জল মুছে দিলাম।
..
--মনের ভাষা যখন এতই বুঝিস তাহলে এতদিন বললি না কেন!
--তুই বললিনা কেন! আমি না হয় বলদ, তুই তো আর বলদ না।
--আমি কিভাবে বলবো? আমি তোর অংকের মাষ্টার না!
--হারামী মাষ্টার তুই।
--হারামী যখন তাহলে নে, বলছি তোকে, "আমি তোকে ভালোবাসি"। এই হারামী তোকে ভালোবাসে। মাষ্টার রিটায়ার্ড নিয়ে ফেলেছে। এখন সে শুধু তার অংকের স্টুডেন্টকে ভালোবাসে।
--আমিও তোকে ভালোবাসি কিন্তু আপাতত আমার অনেক ক্ষুদা লাগছে রে। আমাকে কিছু খাইয়ে দিবি?
..
..
#বন্ধুত্ব
©Aariyaan Shawonরিলেশন ব্রেকাপের পর যখন মাহিয়ার আর বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছেই নতুন করে জন্মাচ্ছিল না , তখন সে সুইসাইড করে নেওয়ার পণ নিয়ে ফেলে। কাঁপতে কাঁপতে হাতে ব্লেড নিয়ে হাতের কব্জি কেটে নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন হঠাৎ দরজার সামনে আমাকে দেখে আর সাহস এগিয়ে নিতে পারলো না। ব্লেডটা হাত থেকে ফেলে হাউমাউ করে কেঁদে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি জানতাম ওর মত মেয়ে সুইসাইড করার কথা স্বপ্নেও আনতে পারবে না কিন্তু বুকের বাঁ পাশে প্রতিনিয়ত ভয়ের শঙ্কা বাজছিল যদি কিছু করে ফেলে!
তাই ছুটে আসলাম।
..
এরকম পরিস্থিতিতে তাকে সান্ত্বনা দেবার বদলে আমার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল। সুইসাইডের জন্য না আবার। সে সুইসাইড জীবনেও করতে পারবেনা। যে মেয়ে একটু আঘাত সইতে পারেনা সে কিভাবে কব্জি কাঁটার পর রক্ত দেখে ঠিক থাকবে!
..
আমার রাগ মূলত আমার নিজের ওপর। আমিই ওকে খারাপ সঙ্গ থেকে দূরে রাখতে পারিনি। দূরে রাখা তো দূর, আমি এটাও জানতাম না যে আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড আমার অগোচরে অন্যকারোর সাথে রিলেশন করছে। সে কত দানা ভাত মুখে দিত এটাও আমাকে গুনে গুনে বলতো কিন্তু রিলেশনের মত এত বড় কথা আমাকে জানায়নি।
যদি আমি মানা করি দিতাম!
..
আমি বহুদিন কথার ফাঁকে ফাঁকে রিলেশনশিপ নিয়ে লাভ-ক্ষতির অংক কষতাম আর তাকে বুঝাতাম। আমি বারবার জোর গলায় বলতাম রিলেশন না করতে। কিন্তু সে আমার লাভ-ক্ষতির অংক উপেক্ষা করে ভদ্রবেশী এক বখাটের সাথে রিলেশনে জড়িয়ে পরে। যদি শুধু রিলেশনে জড়িয়ে থাকতো, তাহলে মোটামুটি সীমার মধ্যে রাখতাম, কিন্তু সে ফিজিক্যাল রিলেশনেও এগিয়ে গেল। সাতমাস ধরে প্রেম চলছিল তাদের কিন্তু আমি কোনরকম গুণাভাস পাইনি। ভেজা চুলায় যখন মোটামুটি আগুনের ফুলকি দেখতে পেলাম তখন সোজাসুজি আমি তাকে ধরে ফেললাম। কিন্তু একটু বেশি দেরী করে ফেলেছিলাম।
..
গত কয়েকদিন ধরে মাহিয়ার আচরণে অনেক নিস্তব্ধতার আর্তনাদ শুনতে পেলাম। আমার মেসেজের কোন রিপ্লাই দেয় না, কলও রিসিভ করেনা। নইলে অন্যান্য দিনগুলোতে ওর কল মেসেজের যন্ত্রণায় আমি অতিষ্ঠ হয়ে যেতাম।
ওর মামার কাছ থেকে জানলাম সে খাওয়া-দাওয়া গোসল সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে। কথাটা শুনে আমার কাছে অনশনের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি লাগছিল।
আগুনের ফুলকি তখন আরো কিছুটা জ্বলে উঠলো।
..
আমি এসে দেখলাম সে বদ্ধ রুমের মধ্যেই জীর্ণ হয়ে বসে আছে। মামার সামনে ভয়ে আমাকে কিছু বলতে পারছেনা। কিন্তু মামা যেতেই ও সব আমাকে খুলে বললো। ছেলেটা সেইদিন লুকিয়ে সবকিছু ভিডিও করেছে আর এখন সে মোটা অংকের টাকা চাচ্ছে। কিভাবে সে এত টাকা দিবে আর মামা যদি জানতে পারে তাহলে ওর কি নাজেহাল অবস্থা হবে সেই ভয়ে রুম থেকেই বের হচ্ছিল না।
..
যাক, দেরীতে হলেও সবকিছু জানতে পারলাম। সবকিছু স্পষ্ট পরিষ্কার হল। তখন আমি তাকে সলুশন দেওয়ার মত কিছু বলতে পারলাম না। শুধু বললাম আমাকে কিছু সময় দে, আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি। প্রথমে তার চেহারা দেখে বুঝতে পারছিলাম না কিন্তু শেষে হাসি দিয়ে বুঝালো আমার ওপর আস্থা আছে।
..
দুদিন ধরে মেয়েটা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করেনি। আমি তাকে ভাত খাইয়ে দিলাম। এর আগে অনেকদিন আমি তাকে এভাবে ভাত খাইয়ে দিতাম। দু-দিন পর পর সে বায়না ধরত আমি যেন এসে তাকে খাইয়ে দিই। আর আমিও যেকোন দরকারি কাজ ফেলে এসে ওকে ভাত খাইয়ে দিতাম। ওর রাগও ভীষণ বেশি। যদি একটু দেরী করে ফেলি তাহলে আর খাবেই না। ছোটবেলায় মা-বাবাকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছিল। মামা একজন আছে যে সারাদিন ব্যবসায় ডুবে থাকেন। কারো সাথে যে মন খুলে কথা বলবে তাও তার ভাগ্যে ছিল না। তারপর তার জীবনে আমি আসলাম। সেইদিন থেকে সে আর একটা সেকেন্ডের জন্য মুখ থেকে হাসি আড়াল করেনি।
তাকে খাইয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে আমি বাসায় চলে আসলাম।
..
বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে ভাবতে লাগলাম কিভাবে ছেলেটাকে আটকানো যায়! আর যদি আটকাতে না পারি তাহলে এতগুলো টাকা কিভাবে সংগ্রহ করবো!
মাথা কাজ করছিল না, হ্যাং করছে। পরীক্ষায় ফেল করার পর এতটা টেনশন করিনি ভবিষ্যতের জন্য হায় আমি বাকী জীবনে কি করবো! দুবেলা আলু-মাংস দিয়ে ভাত না খেলে শরীর যে চুপসে যাবে সেটা নিয়েও একফোঁটা টেনশন করতাম না। কিন্তু মাহির (মাহিয়া, সংক্ষেপে মাহি বলে ডাকি) সব ছোট ছোট সমস্যাগুলোতে আমি কেমন জানি অস্থির হয়ে যাই।
বছরখানেক আগে একবার বলেছিল ওর চুল পরে যাচ্ছে। আমি নেটে সার্চ করে জানতে পারি একটা ওষুধিপাতা আছে যেটা লাগালে চুল পরা বন্ধ হয়। বাসা থেকে পঁয়ষট্টি মাইল দূরে একটা জঙলে গিয়ে গাছে উঠে ওর জন্য পাতা এনেছি যেখানে আমি সামান্য হাঁটা চলায় অসুস্থ হয়ে পরতাম।
আমি একবার তাকে একটা নূপুর কিনে দিয়েছিলাম। ওর খুব ভালো লেগেছিল এটা। কিন্তু একদিন পছন্দের নূপুরটা পুকুরে পরে গিয়েছিল। তার কান্না দেখে আমি সহ্য করতে না পেরে সারা পুকুর তোলপাড় করে নূপুর বের করে দিয়েছিলাম। এরপর চারদিন আমি বিছানা থেকে উঠতে পারিনি অসুস্থতার জন্য। তারপর থেকে আমি ওকে যা যা কিনে দিতাম সবকটার এক্সট্রা জিনিস আলাদা করে কিনে রাখতাম।
এরকম ওর আরো অনেক ছোট ছোট সমস্যাদি আমি উদ্ভট ভাবে সমাধান করেছি।
কিন্তু বর্তমানেরটা জটিলের চেয়েও বেশ জটিল ছিল।
..
দুইদিন চলে গেল, কিছুই করতে পারলাম না। এরই মধ্যে ওর সুইসাইড এটেম্পট আমাকে আরো টেনশনে ফেলে দিল। অগত্যা কোন উপায়ন্তর না দেখে বাইক কেনার জন্য যতটাকা জমিয়েছি সব টাকা ব্লেকমেলারের হাতে তুলে দিলাম আর সব ক্লিপগুলো ডিলিট করে দিলাম। টাকা কোথায় থেকে এসেছে কিভাবে দিয়েছি সেটা আর মাহিকে জানালাম না। সে বারবার জানতে চেয়েছিল কিন্তু আমি তাকে জানায়নি। বাইক কিনতে না পারার আফসোস মিটিয়ে নিলাম ওর মুখের এক চিলতে হাসি দেখে। প্রথম প্রথম কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু শেষে মানিয়ে নিয়েছি। মাহি
যখন হাসে, ওর গালদুটো গোলাপের পাপড়ির মত ফুলে যায়। হাল্কা গাঢ়রূপ গালে ওর হাসিটা যেন বিষাদিনী বিষ সব শুষে নেয়। ধমকা বাতাসের ঝাপটায় ওর চুলগুলো আমার সারা রাজ্যে প্রশান্তি নিয়ে আসে।
..
আস্তে আস্তে আগের মত সবকিছু ঠিক-ঠাক হল। পড়ন্ত বিকেলের পার্কে হাঁটা, সন্ধ্যের সোডিয়ামের আলোর নিচে ফুসকা খাওয়া, রাতের জোনাক আলোর নিচে শতরাজ্যের কাব্যাদিতে শ-রাত কাটিয়ে দিতাম।
..
আমাদের ফ্রেন্ডশিপ নয় বছরে পদার্পণ করলো। এই নয় বছরের একটা দিনও মিস হয়নাই যে আমি তাকে ভালোবাসি বলিনি। কিন্তু সে কোনদিনও ভালোবাসির উত্তরটা দেয়নি। কিভাবে উত্তর দিবে সে! কোনদিন নিজের কানে শুনেছে আমি তাকে ভালোবাসি বলেছি! আমি তো ঘুটঘুটে অন্ধকার রুমে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ছবি দেখে ভালোবাসি বলি। শুধু ভালোবাসি বলি তা না, মনের ভেতর অজস্র না বলা যত কথা আছে, প্রতিটা রাতে সব কথা ওর ছবি দেখে গুনগুন করে গেয়ে যেতাম।
..
এক তরফা ভালোবাসার মজাই আলাদা। তেলেগু ভাষার সিনেমা বিনা সাবটাইটেলে যেমন হয় সেরকম। না বুঝা যায় সুখ কিরকম, না বুঝা যায় দুঃখ কিরকম। শুধু নিয়মের মত চলে যেভাবে আমি চলছি।
..
ধীরে ধীরে আমরা বড় হলাম। সময়ের সাথে সাথে আমাদের দূরত্বও বাড়তে থাকলো। আমি পড়াশোনার জন্য অন্য সিটিতে শিফট করি। মাসের পর মাস যায় আমি তাকে ভাত খাইয়ে দিই না, ঘুম পাড়িয়ে দিই না। তার অঢেল খুনসুটি বায়নাগুলোও দূরত্বগুলোকে বেছে নিল। মাঝে মাঝে আমাদের কথা হত কিন্তু আমি সময় করতে পারতাম না। দূরত্ব সীমা-পরিসীমা ছাড়িয়ে গেল।
..
একদিন তার কল আসলো। আমার সেদিন গুরুত্বপূর্ণ একটা ইন্টার্ভিউ ছিল। আমি যথাসময়ে ব্যাক করতে পারিনি। রাতে ফ্রি হয়ে কল দিলাম। কিন্তু কোনদিনও ভাবিনি সেই রাতটা আমার জন্য কালরাত্রি হবে। তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলেটার সাথে তার চারমাসের রিলেশন ছিল। দু-পক্ষ রাজি থাকায় প্রেম পেরিয়ে বিয়েরডালা সাজিয়ে ফেলা হল। আমাকে দাওয়াত পাঠালো। বিয়ের এক সপ্তাহ আগে যেন আমি থাকি। বিয়ের সব দায়িত্ব আমার।
..
আমি ভেঙে গেলাম, পুরোপুরি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলাম। যে হ্নদয়টাতে তাকে রেখেছিলাম সেটা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল। এভাবে কেউ আমাকে ধুমড়ে-মোচড়ে দিবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।
..
রিলেশনের লাভ-ক্ষতির হিসেবে এভাবে গণ্ডগোল পাকবে তা আমি আঁচও করতে পারলাম না। এখন চালে-ডালে টের পেলাম কয়েকবছর আগে মাহি কেন ব্লেড হাতে নিয়েছিল। আমার জীবন তো এখানে থেমে থাকার কথা না, তাহলে এখানে থামলো কেন!
..
বিয়ের ডেইট ঘনিয়ে আসলো। যে ইন্টার্ভিউ দিয়েছিলাম সেটার রেজাল্ট হাতে পেলাম। অস্ট্রেলিয়ায় জব পেয়ে গেলাম। অবশেষে জীর্ণশীর্ণ জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট খুজে পেলাম। এখানে ধম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। যেদিকে পা দিই সেদিকে মাহিকে দেখি। এইতো এই রাস্তায় ওকে নিয়ে হাঁটতাম, ওই গলির শেষ মাথার দোকানটায় ফুসকা খেতাম। ওই ব্রিজে যানবাহন না থাকলে দু-পা মেলে শুয়ে পরতাম। সবকিছু চোখের সামনে ভাসছিল। কষ্টগুলো আমাকে একদম মেরে ফেলছিল। তাই সব স্মৃতিকে এখানেই দাফন করে মাহিকে না জানিয়ে চলে গেলাম।
..
দেখতে দেখতে তিনটা বছরের ক্যালেন্ডারের পাতা শেষ হয়ে গেল। এই তিন বছরে আমি একবারও মাহির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করিনি। হয়তোবা সে চেষ্টা করেছিল কিন্তু জানেনা আমি কোথায়। নতুবা চেষ্টা নাও করতে পারে। কেননা বিয়েতে তো আর যাইনি রাগও করেছে। আর কোথায় এসেছি তাও তো জানাইনি। মাঝেমধ্যে ওর কথা মনে পরে কিন্তু কাজের তালবাহানায় সবকিছু চাপিয়ে রাখি। কি দরকার কষ্টটাকে তীব্র করার!
..
জানিনা সে এখন কেমন আছে! কোথায় আছে! স্বামীর সঙ্গে হয়ত সুখের সংসার বুনছে। এতদিনে হয়ত তার কোলজোড়ে সন্তানও এসেছে। এক-দু বাচ্চার মাকে এখন দেখতে কিরকম লাগবে? চঞ্চল তো মোটেই থাকবে না, সংসার চালাচ্ছে যখন সংসারীর মতই লাগবে। শাড়ি-টাড়ি কি পরে! নাকি পরতে গিয়ে প্যাঁচ লাগিয়ে বারোটা বাজিয়ে ফেলে! আমি কতবার তাকে বলেছিলাম শাড়ি ভালো করে পরতে। কিন্তু যে জিনিসটার প্রতি তার অনীহা সেটা হাজারবার বললেও কানে ঢুকবে না। ছোট্ট মনে কোটি-কোটি প্রশ্ন তাকে ঘিরে। কিন্তু উত্তরের জন্য তার অনুপস্থিতি আমাকে হাহাকার করে তুলে।
..
প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে পিওনী নামের একটা বিদেশি ফুল কিনে বাসায় নিয়ে যেতাম। এই ফুলেরগন্ধ এতটা ঘ্রাণেন্দ্রিয় যে আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়প্রবণ প্রেমের আমেজ রাঙিয়ে তুলে। প্রথম যখন এদেশে আসি সর্বপ্রথম এই ফুলটাতে আমার নজর কাড়ে। দেখা মাত্রই গুনগুনিয়ে বললাম ইশশ মাহিকে যদি এই ফুলেরতোড়া দিতাম তাহলে সে অনেক খুশি হত। যেহেতু এই ফুল দেখে ভালো লাগলো তাই প্রতিদিন এটা বাসায় নিয়ে যেতাম আর রুমে রাখতাম। যদিও এতে কোন লাভ হত না তবে ভালোলাগার বিষয়টাতে আমি কৃপণতার সুযোগ দিচ্ছিনা।
.
প্রত্যেকদিনের ন্যায় আজও ফুলেরতোড়া কিনতে স্টলের সামনে এলাম। এখানে শ-জাতের ফুলের সুভাস বেরোচ্ছে। কিন্তু একটা সুভাস অনেক পরিচিত মনে হচ্ছে। অনেককাল ধরে যেন এই সুভাসটাকে মিস করছি। একটা জিনিস বুঝতে পারলাম না এতকিছুর সুভাসের আড়ালে এই সুভাসটাই কেন নাকে আসছে! হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজনের মেয়েলি কন্ঠ শুনতে পেলাম। পেছনে তাকাতেই আমার চোখ দাঁড়িয়ে গেল। আমি একি দেখছি! স্বপ্ন নয়তো! গায়ে নীল শাড়ি, হাতে নীল চুঁড়ি, কপালে নীল টিপ, অদম্য খোলা চুলে মাহি দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্রতুষার আকাশে রাতের কল্পনায় আমি তাকে ঠিক এরকমই স্বপ্নে দেখতাম। কিন্ত সে এখানে কি করে? কিভাবে জানলো আমি এখানে? আবার আমার পেছনেই? উত্তরের চেয়ে আমি অবাক বেশি। কোনটা আগে জানবো তার হদিস মিলাতে পারছিনা।
..
আজ বহু বছর ওর কন্ঠ শুনলাম। ঠিক একিরকম সাজে সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে জিজ্ঞেস করলো;
..
--কি অবস্থা রে হারামীর হারামী?
আগেও সে আমাকে এরকম জিজ্ঞেস করতো, ঠিক একি সুরে, একি গলায়, একি ভঙ্গিতে। আমি জবাব দিলাম;
--হ্যা ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
যদিও তুমিতে অস্বস্তিবোধ করছি তবুও আগেরমত তুইতে যেতে পারবো না।
--আমি তো মনে করেছি তুই আপনিতে কথা বলবি। হ্যা ভালো আছি।
--তুমি কিভাবে জানলে আমি এখানে?
--না বলে চলে গিয়েছিলি এজন্যই নাকি আমি তোকে খুজতে চলে আসবো?
--না মানে! আসলে!..........
--থাক থাক, আর কষ্ট করে মিথ্যে বাহানা বানাস না।
--হুম, আচ্ছা।
--কি করোস? ফুল কার জন্য? বউয়ের জন্য নাকি?
--আমি বিয়ে করিনি।
--তাহলে গার্লফ্রেন্ড? তুই না প্রেমে বিশ্বাস করতি না?
--গার্লফ্রেন্ডও নেই।
--তাহলে কার জন্য?
--রুমে ফ্রেগ্নেন্সের জন্য।
--তুই আগের মতই জটিল রয়েছিস। রুম স্প্রে থাকতে ফুল ইউজ করিস কেন?
--যেভাবে ভালো লাগে সেভাবে।
--নাকি কাউকে এই ফুলে মানাবে এজন্য রুমে নিয়ে যাস?
..
উপ্স! সে কিভাবে জানলো এটা? আমি তো কোন ডায়রী লিখিনি যে সেখান থেকে পড়বে! বেশি ভাবলাম না, পরে বলবে মিথ্যে বাহানা খুজছি।
..
--আরেহ না না এরকম কেউ নেই।
--না থাকলেই ভালো। তো বিয়ে-শাদি করোস নাই কেন?
--এমনি।
--এমনি আবার কিরকম বাহানা? সত্যি করে বল,
--মনের মত পেয়ে গেলে বিয়ে করে নিবো।
--দুয়া করি যেন তাড়াতাড়ি পেয়ে যাস।
--তা, স্বামীর সাথে এখানে এসেছো নাকি?
--হ্যা, তো কে নিয়ে আসবে?
--না, ঠিক আছে। আর বাচ্চারা? মেয়ে না ছেলে?
--আমার সন্তান নেই।
--ওহ। তা স্বামী কোথায়?
--তুই এত জ্বামাই জ্বামাই করছিস কেন?
--না, দেখতাম শুধু,
--তো বিয়েতে আসিসনি কেন?
--এর আগেই এখানে চলে এসেছিলাম।
--আমাকে না জানিয়ে আসতে পারলি?
--সরি।
--একবারও কি আমার খোজ নেয়ার চেষ্টা করিস নি?
--ব্যস্ত থাকি সবসময়।
--তো, প্রতিদিন এখান থেকে ফুল নিয়ে যাওয়া কি ব্যস্ততায় পরে না?
--তুমি কিভাবে জানলে আমি এখানে প্রতিদিন আসি?
--তোকে কয়েকদিন ধরে ফলো করছি। তোর বাসার এড্রেসও জানি। 29 Greenland park……………।
--হয়েছে হয়েছে। তো এতদিন ফলো করলে কেন? সামনে আসলেই পারতে।
--আজকের জন্য অপেক্ষা করছি।
--আজকে কি?
--তোর জন্মদিন রে গাধা।
আমার মাথায়ই ছিল না আমার জন্মদিন আজকে। লাস্ট তিন বছর ধরে আমি একবারের জন্যও মনে করিনি আমার জন্মদিনের কথা। আমি আগেও কোনদিন আমার জন্মদিনের কথা মনে রাখতে পারতাম না। সে প্রত্যেকবার মনে করিয়ে দিত। আজও মনে করিয়ে দিল।
--তুই এখনো তোর জন্মদিনের কথা মনে রাখতে পারোস না?
--কি দরকার এসবের? শুধু শুধু সময় নষ্ট না!
--অনেক বড় হয়ে গেছিস রে তুই।
--হুম জানি।
--তা তোর জন্য আমি একটা সারপ্রাইজ প্লান করেছি। তুই নিয়ে যাবি আমাকে? তোর বাসায়!
--সারপ্রাইজ প্লান? আমার বাসায়! মানে?
--আগে যেভাবে তোকে জন্মদিনের সারপ্রাইজ দিতাম সেভাবে। তুই কোন নাহ-নো করবিনা। চল.
..
আমিও আর কথা বাড়ালাম না। এতদিন পর ওকে দেখতে পেয়েছি আর সে যখন বাসায় যেতে চাচ্ছে তাহলে না করার কি দরকার! আমি স্বপ্নেও ভাবিনি এজীবনে আমি সচক্ষে মাহিকে দেখতে পাবো। গাড়ি ড্রাইভ করছিলাম। নয়ত বারবার দাঁতে কামড় খেয়ে দেখতাম এটা স্বপ্ন না তো!
আড়চোখে বারবার তাকে দেখছি। যখনই চোখে চোখে নজর পরে যায় আমি লজ্জা পেয়ে যাই। কিন্তু তাকে বুঝতে দিচ্ছিনা। বাইরের দিকে তাকিয়ে বলি ওটা জনসনের ঘর, ওটা ডেভিডের ঘর। সে হ্যাঁ হ্যাঁ বলে জবাব দিচ্ছে আর মুচকি হাসছে।
একি! সে হাসছে কেন! তাহলে কি আমি ধরা খেয়ে গেলাম!
ইশশ!!........
..
গাড়ি থেকে নামলাম। বাসার উলটোদিকে যে পার্কটা আছে সেটা আজ অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। মনে হয় আজকে ওইখানে কোন বড় ধরনের পার্টি আছে। আমি মাহিকে বাসায় নিয়ে গেলাম। তাকে কফির অর্ডার করলাম সে উলটো আমাকে ধমক দিয়ে বললো যা তো ফ্রেশ হয়ে নে। আমি বরাবরের মত ওর কথা শুনে গেলাম।
..
শাওয়ার অন করে দাঁড়িয়ে আছি। হাতটা ওয়ালে ধরে বুকে হাত দিলাম। আজ অনেকদিন পর বুকের ব্যথা কম মনে হচ্ছে। শান্তিতে নিশ্বাসও ফেলতে পারছি। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখি আমার চোখ-মুখে অন্যরকম হাসি যে হাসিটা আগে সবসময় আমার মুখে লেপ্টে থাকতো। কারণটা তো অবশ্যই সে। সে ছাড়া যে আমি নির্লিপ্ত সেটা আমি অনেক আগেই বুঝেছি।
..
ফ্রেশ হয়ে বের হলাম। মাহিকে ডাক দিলাম, সে কোন জবাব দিল না। সারা বাসা তন্নতন্ন করে খুজলাম, পেলাম না। সে চলে গেল নাকি!!
ফোনটা বের করে কল দিবো, হঠাৎ মনে পরলো ওর তো নাম্বারই রাখা হয়নি। বিষণ্ণ হয়ে বেডরুমে আসলাম। খেয়াল করলাম সাদা বেডসিটের ওপর কিছু রাখা আছে। দেখি একটা নীল রঙের স্যুট বিছানার ওপর রাখা। স্যুটের উপর একটা চিরকুটও। স্যুটটার দিকে আর নজর দিলাম না, চিরকুট হাতে নিলাম। লিখা ছিল ,"এই স্যুটটা আমি তোর জন্য কিনেছি। এটা পরে বাইরে আয়। আমি অপেক্ষা করছি।"
..
অবশেষে বুকে জান ফিরে পেলাম। তখন আমি প্রথমবার স্যুটের দিকে তাকালাম। আমি মনে করেছি আমার কোন স্যুট আলমারি থেকে বের করে রেখেছে।
..
যাক! মেয়েটার পছন্দটাও আমার ঘুটঘুটে অন্ধকারের স্বপ্নের মত মিল ছিল। আমারও অনেক ইচ্ছে ছিল আমি নীল স্যুট পরে মাহি নীল শাড়ি পরে নীল নীলাম্বরে হারিয়ে যেতে। এক আকাশের নিচে দুইটা নীলাভ পাখি ডানা মেলে উড়বে, ভালোবাসায় নিজেদেরকে বিলিয়ে দিবে এক অজানা শুভ্রমৌলিতে। এরকমই ছিল আমার ধূসর স্বপ্নজাল। কিন্তু এই ধূসরতায় কেন যে রঙধনুর সাতটা রঙের আভাস সোনালি গোধূলিতে ভেসে যাচ্ছে বুঝতে পারছিনা।
আসলেই কি সাতটা রঙ দেখা যাবে! কিভাবে? রঙধনু কিরকম! মাহি নয়তো সেই রঙধনু! নাহ! মাহি কিভাবে হবে! ওর স্বামী আছে।
তাহলে কি আমি ভুল ভাবছি!
নাহ! ভুল তো হবে না। আমি স্পষ্ট ইঙ্গিত পাচ্ছি আমার ভেতরে অন্যরকম এক সুখেরকাঁটা আমাকে তছনছ করছে।
..
ভাবতে ভাবতে রেডী হয়ে গেলাম। দরজা খুলতেই দেখি নিচে বড় একটা মাদুর বিছানো। দেখলাম আমার দরজার সিঁড়ি থেকে পার্কের গেইট পর্যন্ত এই মাদুরীয় মাধুর বিছানো। আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। আর এক পাও এগুলাম না। পার্কের মাদুর আমার দরজার সামনে কেন! কে লাগালো!
তখন হঠাৎ মাহি ডাক দিল। বললো এই মাদুরের ওপর যেন হেঁটে আসি। আমি কিছু সময়ের জন্য নির্বাক হয়ে গেলাম। পার্কের মাদুরের সাথে আমার সম্পর্ক কি! মাহি জোরে একটা ধমক দিল। আমি ভাবনাটাকে এখানে স্টপ করে হাঁটা শুরু করলাম।
..
ধীরে ধীরে পার্কের গেইটের সামনে গেলাম। সব দিকে আমার নামের প্লেকার্ড লাগানো। সরি দোস্ত, মিস ইউ হারামী এগুলো টাইপের। পার্কে অনেক বেলুন লাগিয়েছে। সবটা লাভ শেইপের। আচ্ছা, তাহলে কি পার্কটা সে ডেকোরেশন করেছে!! তাও আমার জন্য!!
সে আমার হাত ধরে ভেতরে ঢুকালো। এতবছর পর আবার ওর হাতের স্পর্শ পেয়ে সেই আগের ফিলিংস চলে আসলো। আমি ওর দিকে তাকিয়েই রইলাম। সে সামনের দিকে তাকাচ্ছে। আমি সামনে তাকালাম দেখি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! দেখলাম বড় একটা কেক টেবিলের ওপর রাখা। কেকের ওপর লেখা ছিল "হ্যাপি বার্থডে আমার হারামীটা"।
আগেরবারের মত ঠিক একিরকম উইশ করলো। মেয়েটা এখনো কিছু ভুলেনি। আমিও তো কিছু ভুলিনি।
..
ওর হাতটা ধরেই কেক কাটলাম। আগে ঠিক যেরকম মজা করে হেসে হেসে কেক কাটতাম আজও ঠিক সেরকম কাটলাম। আমি অজান্তেই কেক কেটে তাকে খাইয়ে দিলাম আর অল্প কেক ওর গালে লাগালাম। আমি তখন একটুও হুশে ছিলাম না। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম আমার সাথে ওর দূরত্বের কথা, ওর স্বামীর কথা। সেও আমার গালে কেক লাগিয়ে দিল। হঠাৎ দেখলাম তার মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। আমি খেয়াল করলাম সেটা। তার চোখের কোণে জল। পৃথিবীর সব জিনিস আমি সহ্য করতে পারি শুধু ওর চোখে জল সেটা আমি জীবনেও সহ্য করতে পারবোনা। আমি আর নিজের নতুন পার্সোনালিটিকে আগলে রাখতে পারলাম না। সেই আগের রূপে আগের ভাষায় আগের ভঙ্গিমায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম;
--মাহি! কি হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন!
..
--আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি রে।
--কি ভুল করেছিস?
--তুই যে স্বামীর কথা বারবার বলছিস সে স্বামী কোন স্বামীর জাতই না, নরপিশাচ একটা। আমি তাকে ভালো মনে করেছিলাম। কিন্তু তার আসল রূপটা আমি বিয়ের পর জানতে পারি। এর আগে সে দুইটা বিয়ে করেছে। বিয়ের পর বউকে ঘরে রেখে সে অন্য জায়গায় মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করতো। একদিন তার এক বন্ধুর কল আসছিল। সে তখন ঘুমাচ্ছিল। আমি কল রিসিভ করতে ওপাশ থেকে ছেলেটা বললো; "তোর বউকে কবে আনবি! শালা আমাদের বউকে নিয়ে তো ভালোই এঞ্জয় করেছিস। এবার আমাদেরও করতে দে। কালকে একটা জবরদস্ত পার্টি আছে। তোর বউকে নিয়ে আসিস কিন্তু।"
আমি কল কেটে দিলাম। আমার মাথায় যেন বজ্রপাত পরলো। আমি নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আমি যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি সে এরকম নোংরা চরিত্রের হবে!
সে ঘুম থেকে উঠলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, প্রথম প্রথম অস্বীকার করলেও পরে করেনি। আমাকে মারধর করে আমাকে রুমে বন্ধী করে রাখে। তারপর যখন জানতে পারলাম সে আজকে তার বন্ধুদের নিয়ে এসে আমার ইজ্জত নিলামে তুলবে আমি আর একমুহুর্ত দেরী না করে সেখান থেকে পালিয়ে যাই।
মামাকে গিয়ে সব বললাম। মামাও ইতিমধ্যে সব জেনে গিয়েছিলেন। সে মামাকে ফোন করে হুমকি দিয়েছে আমি যদি ফিরে না আসি তাহলে আমাকে দেখে নিবে। আমি ভয় পেয়ে যাই। কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তোকেও খুজে পাচ্ছিলাম না। ওইসময়টাতে তোকে আমার অনেক জরুরি ছিল। তাই অনেক ডিপ্রেশনে পরে গিয়েছিলাম।
তোর মনে আছে একটা ছেলে যে আমাকে ব্লেকমেল করে টাকা খুজেছিল! একদিন তাকে শপিংমলে পেয়েছিলাম। তার কাছ থেকে জানলাম তুই তোর প্রথম বাইক কেনার জমানোর টাকা ওকে দিয়েছিস। বিশ্বাস কর, আমি কেঁদে দিয়েছিলাম এটা শুনে। তুই আমার জন্য এতকিছু করেছিস আর আমি কি করলাম! আমি আরো ভেঙে পরি।
তারপর মামা আমার করুণ অবস্থা দেখে আমাকে কানাডা খালার কাছে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে গিয়েও অস্থিরতা কাটেনি। অবশেষে তোকে খুজতে শুরু করলাম।
..
-- তাহলে আমাকে খুজে পেলি কিভাবে?
..
--মামার এক ফ্রেন্ড, এখানেই থাকেন, নাম চার্লস। মামা উনার সাথে তোর ছবি দেখেছেন। তারপর আমাকে জানালেন। আমি আস্তে আস্তে সব খবর নিলাম। উনি তোর...........।
--আমরা একি কোম্পানিতে ম্যানেজিং ডিরেক্টর।
--হ্যা, তারপর তোর সব বায়োডাটা নিয়ে এখানে চলে আসলাম।
..
আমি ওর কথা শুনে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কি বলবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। হাসবো নাকি কাঁদবো তাও জানিনা। সে বললো;
..
--তুই যতদিন আমার পাশে ছিলি, আমি কোন বিপদে পরতাম না। তুই না থাকলেই আমার সব বিপদ আসে। কেন!
--জানিনা।
..
আমি চাচ্ছিলাম না নিজেকে আর দুর্বল করবো। সে আমার হাতটা ধরে বললো;
..
--সত্যি করে বল,
..
আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না।
..
--তোকে আগলে রাখতাম তাই,
--অন্যকেউ আমাকে আগলে রাখতে পারে না কেন!
--তা আমি কি করে জানবো?
--বিয়ের কথা শুনে তুই চলে এসেছিলি। না?
--না, মানে?
--সত্যি করে বল,
--হ্যা, বিয়ের কথা শুনেই এসেছিলাম। কিন্তু এখন এ বিষয় নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। আমি কয়েকবছর আগে সবকিছু দাফন করে এসেছি।
--কবর থেকে সব তুলে বল, আমি আজকে সব শুনবো। শুনার জন্যই এতদূর এসেছি।
--কি শুনবি আর? শুনার মত কিছু আছে? তুই তো সবকিছুই শেষ করে দিয়েছিস। আমিও সবকিছু দাফন করে দিয়েছি। বলার মত আর কিছু বেঁচে নেই।
--বেঁচে আছে। অল্প হলেও লাশগুলোতে প্রাণ আছে। তুই বল না রে, প্লিজ।
..
বলার সাথে সাথেই সে হাঁটু গেড়ে মাটিতে লুটিয়ে পরলো। আমি তাকে তোলার চেষ্টা করলাম, সে বাধা দিল। সে বললো;
..
--আমি আর পারবোনা রে, আর পারবোনা তোকে ছাড়া। তুই ছাড়া আমি অচল। মামা ঠিক-ই বলতো, তুই যেরকম আমাকে আগলে রাখতি, যেরকম খেয়াল রাখতি, আর কেউ এরকম পারবেনা। আমি জানি তুই আমাকে ভালোবাসিস, অনেক ভালোবাসিস, এতটাই ভালোবাসিস যে আমাকে ছাড়া তুই একমুহূর্তও থাকতে পারবিনা। আমি জানি, তুই নিজে খাইতে সময় এখনো আমাকে মিস করিস। মনে মনে বলিস না ইশ মাহিকে যদি আবার খাইয়ে দিতে পারতাম!
তুই কি চাস না আমাকে নিজের ছায়ায় রাখতে!
..
আমি ওর কথা শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। আমি এতদিন ধরে যে জিনিসটা মনের মধ্যে পুঁতে রেখেছিলাম সেটা সে এক ঝাটকায় উখড়ে তুলে দিল। সে কথাগুলো বলে কাঁদছে, ঠিক আমিও কাঁদতাম। কিন্তু ওর চেয়ে বেশি। সে এই কয়েকদিনে আমাকে ভালোবেসেছে। কিন্তু আমি তো একযুগ ধরে। আমার কি এতদিনের সব কষ্টের মূল্য শুধুমাত্র চোখের কোণের একফোঁটা জল?
..
নাহ, আর পারবোনা। আমি আর পারবোনা ওকে অপেক্ষা করাতে। নিজেও তো আর অপেক্ষা করতে পারছিনা। কাউকে ভালোবাসলে কি অপেক্ষা করা যায়! না, যায় না।
আমি এটা কি বলছি! আমি নিজে একযুগ ধরে অপেক্ষা করছি আর এখন বলছি অপেক্ষা করা যায় না!
..
একযুগ চলে গেল মাহিকে একতরফা ভালোবেসে। কিন্তু মনে হচ্ছে ১২সেকেন্ড আগেরই কথা। সময় এত তাড়াতাড়ি গেল কিভাবে? কষ্টের সময়গুলো জানতাম বেশিদিন টিকে। কিন্তু আমার তো উলটো মনে হচ্ছে।
আমার কি এতই ধৈর্যক্ষমতা! নাকি এটা ভালোবাসার কোন যোগান!
আমি ওকে দাড় করালাম। আমার হাতে হাত ধরে ওকে বুকের ধারে রাখলাম। সে কেঁদেই চলছে। আবার সহ্য করতে পারছিনা ওর কান্নাগুলো। হুট করেই ওকে বুকে টেনে নিলাম। স্যুটটা ভিজিয়ে দিল তার জলে। সে জিজ্ঞেস করলো;
--আমার কেনা স্যুট, ভিজলে সমস্যা না।
আমি অবাক হয়ে গেলাম। কিভাবে বুঝলো আমি স্যুটের কথা ভাবছি! আমি ওর জল মুছে দিলাম।
..
--মনের ভাষা যখন এতই বুঝিস তাহলে এতদিন বললি না কেন!
--তুই বললিনা কেন! আমি না হয় বলদ, তুই তো আর বলদ না।
--আমি কিভাবে বলবো? আমি তোর অংকের মাষ্টার না!
--হারামী মাষ্টার তুই।
--হারামী যখন তাহলে নে, বলছি তোকে, "আমি তোকে ভালোবাসি"। এই হারামী তোকে ভালোবাসে। মাষ্টার রিটায়ার্ড নিয়ে ফেলেছে। এখন সে শুধু তার অংকের স্টুডেন্টকে ভালোবাসে।
--আমিও তোকে ভালোবাসি কিন্তু আপাতত আমার অনেক ক্ষুদা লাগছে রে। আমাকে কিছু খাইয়ে দিবি?
..



0 Comments: