ত্যাগ

গল্প নং: (১১)
নামঃ ত্যাগ
.
আমি যে ছেলেটাকে প্রচন্ড ভালোবাসি সে কোনদিনও আমাকে পাত্তা দেয়নি,এই জীবনে কোনদিন দেবে বলেও সেই আশা নেই। ভদ্রলোকের নাম হাসানুল করিম। ডাক নাম আরাফ। সম্পর্কে সে আমার খালাত ভাই। আরও একটা পরিচয় গোপন করা হয়েছে; তা হল সে একটা হত্যা মামলার আসামী। যাকে হত্যা করা হয়েছে সে আঙ্কেলের বন্ধু এবং একাধারে ভাইয়ার গৃহশিক্ষকও ছিলেন এক সময়। এই হত্যাকান্ড নিয়ে আমি মোটেও বিচলিত নই কারণ অনেক আগেই সে আরও একটা সুপ্ত হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। প্রণয়তীরে এফোঁড় ওফোঁড় করে বিদ্ধ করেছে আমার হৃদয়। সেই হৃদয়হত্যার বিচার কি হয়েছে? এই হৃদয়হত্যা কবে, কখন ঘটেছে তার সঠিক হিসেব আমি রাখিনি।
.
বড় খালা মারা গেছেন সেই কবে! খালুজান আর বিয়ে করেননি। মাতৃস্নেহ থেকে সে পুরোদমে বঞ্চিত হয়নি। কিঞ্চিতের চেয়েও অধিক স্নেহ সে তার ছোট খালা মানে আমার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে। ঐ তো গত সপ্তাহেই হুট করে বাসায় এসে হাজির। চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে হাঁকডাক ছাড়ল, " খালামনি কোথায় গেলে তুমি?"
আমি কপট রাগ করার অভিনয় করে বলি," ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছ কেন? চুপচাপ বসো। মা বাজারে গিয়েছেন।"
আরাফ ভাই মুচকি হেসে বললেন," তুই এমন ভাব করছিস যেন আমি আসাতে তোর কোন ক্ষতি হয়েছে,অপূরণীয় ক্ষতি কিন্তু তুই মনে মনে খুশি সেটা আমি জানি। " এই বলে সে গা কাঁপিয়ে হাসছে।
.
আমি ওর দিকে অপলক নয়নে তাকালাম। খোঁচা খোঁচা দাড়ি,এলেমেলো চুল,হলুদাভ গায়ের রঙ যেন চারপাশে ঠিকরে বেরিয়ে যাচ্ছে। ডান গালে সামান্য কাটা দাগ,সম্ভবত ব্লেডে কেটেছে। লালচে দাগটা রীতিমত চোখে পড়ছে। সে দাগ ছুঁয়ে দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, " পুরুষ মানুষ এত সুন্দর হবে কেন?"
তাদের সুন্দর হয়ে জন্মানোটা ভয়াবহ অন্যায়ের পর্যায়ে পড়ে। নারীজাতি পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে কিন্তু সেই ভস্মের কোন মূল্য নেই,তা কেবল ব্যবহৃত হবে দাঁত মাজার উপাদান হিসেবে। এইসব রূপবান পুরুষ না বুঝবে কোন নারীর চোখের ভাষা, না বুঝবে কোন নারীর ধীরে ধীরে অঙ্গার হয়ে যাওয়ার বেদনা। এক্ষেত্রে পুরুষ হয়ে জন্মানোর যথেষ্ট সুবিধা আছে। লাজ লজ্জা ভেঙে অন্তত বলা যায়, "আমি কিন্তু বিষ খাব" নরম হৃদয়ের নারী মন আর কতদিন অগলিত থাকবে?
.
আরাফ ভাই সোফায় গা এলিয়ে হাই তুলে বলল, " কিছু খেতে দে নিশি। পাঙ্গাস মাছের মত ক্ষিধে পেয়েছে। চা - টা হলেই চলবে।"
আমি রান্নাঘরে চা বানাতে গেলাম। নীল বয়াম খুলে কয়েকটা বিস্কুট পিরিচে রাখলাম। চায়ের কাপে ছোট্ট চুমুক দিয়ে দেখলাম চিনি ঠিক আছে কিনা।
সে ঝুঁকে পত্রিকা পড়ছে এবং পা দোলাচ্ছে। ফ্যানের বাতাসে তার ঝলমলে চুল উড়ছে। নেভী ব্লু রঙের শার্টে আজ কি তাকে বেশি সুন্দর লাগছে? একদিন ওদের বাসায় গিয়ে সব আয়না ঝনঝন করে ভাঙতে হবে। এমন যদি হয় আয়নায় নিজেকে দেখে নার্সিসাসের মত আত্মপ্রেমে মুগ্ধ হয়ে আত্মাহুতি দেয় হায় মাবুদ কী হবে আমার!
.
আরাফ ভাই পত্রিকার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, "ভ্যাবলার মত তাকিয়ে আছিস কেন? চা রেখে বিদেয় হ।" আমি বিদায় না হয়ে সামনে গিয়ে বসলাম। সে চায়ে ডুবিয়ে এত আয়েশ করে বিস্কুট খাচ্ছে মনে হচ্ছে এর মত সুস্বাদু খাবার দুনিয়ায় দ্বিতীয়টা নেই। সে চোখ তুলে একটাবার আমার দিকে তাকালো আমি ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেলাম। জগতে সুন্দর গায়ের রঙ,হৃদয় কাড়া
হাসি সব বরাদ্দ থাকা উচিত কেবল নারীর জন্য,ভুল করে বিধাতা দু একজন পুরুষকে দিয়ে ফেলেছেন।
.
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আরাফ ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করল," আচ্ছা নিশি একটা প্রশ্নের উত্তর দে তো।"
আমি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "কী প্রশ্ন?
সে কতক্ষণ ভেবে বলল, "না থাক, কিছু না। "
--আমি যদি বলি তোমার প্রশ্নটা আমি জানি তুমি বিশ্বাস করবে? প্রশ্নটা হচ্ছে --"আচ্ছা নিশি, তুই কি আমাকে খুব ভালোবাসিস?"
--হা হা। তুই অনেক বুদ্ধিমতী। জগতে বুদ্ধিমতীরা ভয়াবহ কষ্ট পায় কারণ সবকিছু তারা বিচার করে যুক্তি দিয়ে। যুক্তিতে হেরে গেলে সহজে মেনে নিতে পারে না। বোকারা সব নিয়তির ঘাড়ে দিয়ে স্বস্তিতে থাকতে চায়,এজন্য তাদের জীবনে বক্রতা কম। তোর বোকা হয়ে জন্মানো উচিত ছিল। তোকে আমি বিয়ে করতাম কিন্তু সমস্যা হল তুই আমার খালাত বোন। আপন বোন আর খালাত বোনের মধ্যে পার্থক্য নেই। আপন বোন বিয়ে করা তো জায়েজ নেই। হাদীস কোরআনে কঠিন নিষেধাজ্ঞা আছে। আর তাছাড়া নিকটাত্মীয় বিয়ে করলে বাচ্চাকাচ্চা অ্যাবনরমাল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। শেষে দেখবি তোর একটা লুলা বাচ্চা হয়েছে। সেটা পালতে পালতে তোর হালুয়া টাইট। তোর ডাক্তারি শিকেয় উঠবে। কথা শেষ হতে না হতেই খলখলিয়ে হাসছে। অাশ্চর্য!
শার্টের কলার চেপে ধরে বলতে ইচ্ছে করছে, "মা আলাদা,বাপ আলাদা অথচ আমাকে বানিয়ে দিচ্ছে আপন বোন। আহা আমার যুক্তির ঠাকুর! আমি লুলা বাচ্চাই পালব। তোর কি রে জানোয়ার?"
.
অতি অাশ্চর্যের ব্যাপার আমি কিছুই বলতে পারলাম না। অভিমানের উষ্ণতায় কামারের হাপরের মত আমার কলজেটা ফুলে উঠছে। ঠোট ফুলিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, " আমি কি দেখতে খুব খারাপ? ভেরি ব্যাড?"
কয়েক বছর পর হয়ত ভেরি গুড গার্ল এসে ওর সংসার করবে। কোন এক শীতের ভোরে হাত ধরে সবুজ ঘাসের শুভ্র শিশির মাড়াবে। মর্মর করে ভাঙবে শিরীষের ডাল,ব্যস্ত দুপুরে ঘুঘুরা ঘাড় ফুলিয়ে ঘু-ঘু-ঘু করে ডাকবে,হয়ত ওকে জোর করে বৃষ্টিতে ভেজাবে । আদিখ্যেতা করে স্বামীর গলা জড়িয়ে বলবে, "পৃথিবীটা এত সুন্দর জানতাম না তো। এখন মনে হচ্ছে মরণেও সুখ...হি হি। "
আচ্ছা তখন আমি কোথায় থাকব? আমি আর ভাবতে পারছি না। আমার চোখে অকারণে জল এসে যাচ্ছে। এসব ঠুনকো আবেগ অল্প বয়সী কিশোরী মেয়েদের মানায়, এই বয়সে এসেও আমার সমস্ত আবেগ বিদ্রোহ করবে তা কি আমি জানতাম? আমি গটগট করে আমার রুমে চলে এলাম।
.
মা বাজার থেকে চলে এসেছে। খালা, ভাগ্নে মিলে জম্পেশ গল্প জমিয়েছে। আমি দু হাতে কান চেপে বসে আছি। শুনতে চাই না কোন গল্প। কী আশ্চর্য আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি কেন? আমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে?
.
যার জন্য মাথা খারাপের পর্যায়ে যাচ্ছে তার কিছু যায় আসে না। এইসব "কিছুই যায় আসে না " টাইপের ব্যক্তিরা খায় -দায়,ঘুমায় আর মাঝে মাঝে মাঝে উদ্ভট রসিকতা করে মেজাজ বিগড়ে দেয়। আমি না খেয়েই হাসপাতালে চলে এলাম। আজ যতজন রোগী আমার কাছে আসবে তাদের ধমক খাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। কোন এক বুড়ি হয়ত এসে বলবে" সারা শরীলে দুক্কু। ভালা অষুদ দেইন গো আম্মা। "
আমি কঠিন চোখে বলব, " আপনার কি ধারণা আমরা বেছে বেছে খারাপ ওষুধ দেই? আপনাদের ওষুধ না দিয়ে বিষ দেয়া উচিত। বিষাক্ত বিষে দুক্কু টুক্কু সব শেষ,চিরশান্তি। যান ভাগেন!"
.
ছিঃ ছিঃ! কী উদ্ভট কথা ভাবছি আমি! দূর থেকে ডাহুকের করুণ ডাক শোনা যাচ্ছে। পক্ষী ডাহুকের ডাক হয়ত সবার কানে পৌঁছে কিন্তু মানবী ডাহুকের করুণ সুর শোনা অত সহজ নয়। সে ডাক শুনতে সাধনা লাগে।
.
আঙ্কেলের আজ দেশে ফেরার কথা। প্রায়ই তিনি বিজনেসের কাজে বাইরে যান। ছোট বেলা থেকেই আরাফ ভাই একা একা মানুষ হয়েছে। আলসেশিয়ান কুকুরটাই তার একমাত্র সঙ্গী। এই বড়লোকি কুকুর আবার কাজের খালা হালিমা বেগমের দু চোখের কাঁটা। প্রায়ই সে মুখ ভেংচিয়ে বলে, " মাইনসে খাওন দাওন পায় না আর হেতিরা করে কুত্তা লইয়া ঢং!"
.
রাত প্রায় দশটা। ক্লান্তিতে আমার শরীর ভেঙে যাচ্ছে। মা খেতে ডাকছেন। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি জোছনা কেমন আলো আঁধারি খেলা খেলছে যেন অসংখ্য জোছনার ফুলে ছেয়ে গেছে। আমার গুণগুণ করে গাইতে ইচ্ছে করছে---
"ঘর খুলিয়া বাহির হইয়া জোছনা ধরতে যাই
হাত ভর্তি চান্দের আলো ধরতে গেলে নাই।"
.
আহা আমার নার্সিসাস তুমি কোথাও নেই!
আমার কোন সাড়া না পেয়ে মা আমার রুমে এলেন।
মা চোখ সরু সরু করে বললেন" ডাকছি কখন থেকে! খাবি না?
-- খেতে ইচ্ছে করছে না।
মা আমার পাশে বসে মৃদু হেসে বললেন, " একটা ভালো খবর আছে, শুনবি?"
আমি জানি এটা অবশ্যই বিয়ের খবর। একটা বয়স পর মায়েদের কাছে এর চেয়ে ভালো খবর দ্বিতীয় আর কিছু নেই। মা আগ্রহ নিয়ে বলা শুরু করলেন, " ছেলেটা আরাফের পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। সম্বন্ধটা ঐ দিয়ে গেল।। "
আমি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললাম " মা ক্ষিধে পেয়েছে যাও ভাত আনো।"
এইসব বিয়ের প্যাঁচাল শোনার চেয়ে জোর করে ভাত গেলা শান্তির।
.
ফোন করে আরাফ ভাইকে কড়া কড়া কথা শোনাতে হবে,সাথে তুই তোকারিও করতে হবে আর কিছু অশ্লীল গালিও দিতে হবে। আমার বিয়ে নিয়ে তার এত চিন্তা কেন? আমি আজীবন কুমারী থাকব তাতে ওর কী?
.
আমার নিত্যদিনের রুটিন মাফিক হাত কাটা,পা কাটা,মাথা ফাটা রোগীদের নিয়ে কর্মব্যস্ততা শুরু হল। কী এক অসহ্য জীবন! তবুও এই অসহ্যের মাঝেও কখনো কখনো সুখের দমকা হাওয়া দোল দিয়ে যায়। মাথা ফাটা লোকটা যখন তেলতেলে মাথা নিয়ে একগাল হেসে বিদায় নেয় তখন মনে হয় এই হাসিটুকু দেখার অার প্রাণভরে অাশীর্বাদ পাবার
ভাগ্যই কজনের কপালে জোটে?
.
রাত জেগে আমি ডায়েরিতে স্মৃতিকথা লিখি তারপর আবার দুমড়ে মুচড়ে জানালা দিয়ে ফেলি। কুটকুট করে ঘুণ পোকা টেবিলের কোণা খাচ্ছে, কটকট করে ফ্যান ঘুরছে মাথার উপর। আমার মত বাস্তববাদী এবং প্রতিষ্ঠিত মেয়েও কোনদিন এমন তুচ্ছ ভাববে নিজেকে সেটাও অবিশ্বাস্য। হুট করে ভারী নিঃশ্বাসে দম বন্ধ হতে চায়। আরাফ ভাই নিজে একদিন আমাকে বলেছে " তোকে বিয়ে দিয়ে আমি তরীকে ঘরে আনব। ও দেখত ভয়াবহ রূপবতী, বুঝলি। হা হা। "
.
যাকে ইচ্ছে তাকে বিয়ে করুক আমাকে শোনানোর কী আছে? কী ভেবেছে আমি সারাজীবন কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলব? নো,নেভার। সময় সবই সইতে শেখায়। কঠিন অবজ্ঞায় এক সময় ঠিক অভিমানের স্তর জন্মে। সেই স্তরের নিচে একরাশ আবেগ তখন চাপা পড়ে মরে যায় সেটাই সত্যি।
.
সপ্তাহখানেক পর আরাফ ভাই এসে হাজির। নিশ্চয়ই সেই বিশিষ্ট পাত্রের খোঁজ নিয়ে এসেছে। সেই ভদ্রলোক তাকে কী এমন ঘুষ দিয়েছে সেই জানে। আমি আরাফ ভাইয়ের সাথে কোন কথা বললাম না। জেদের কিছু অংশ সেও দেখুক। ও শুধু মিটিমিটি হেসে বলল, " এমন পেঁচার মত মুখ করে বসে থাকবি না,বিশ্রী লাগে। "
.
আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম তখনই কলিংবেল বাজল। মা উঠে দরজা খুললেন। দরজা খুলে ওপাশের দুজন মানুষকে দেখে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। লম্বা মতন, শ্যামলা এক মহিলা অগ্নিদৃষ্টি মেলে বললেন " এটা কি ডা. নিশি আফরোজের বাসা? তিনি বাসায় আছেন? "
মা কাঁপা গলায় বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু কেন?
অপর মহিলা ভ্রূ কুঁচকে বললেন " অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে। আপনার মেয়ে মার্ডার করেছে। "
.
আমি মুচকি হাসলাম। জানতাম যে কোন সময় পুলিশ আসবে। আমার নিজেরই অবশ্য সারেন্ডার করা উচিত ছিল। গতকালই ডা. সঞ্জয় পাল আমাকে ডেকে বলেছেন " ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে তোমার কাজিনের ছুরিকাঘাতে মজনু খাঁ মারা যাননি। আঘাতটা স্বল্প ছিল। তাকে পটাসিয়াম সায়ানাইড প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। ডিউটিতে তো সেদিন তুমি ছিলে। তাই না নিশি?"
আমি হাসতে হাসতে বললাম " আপনি যা ভাবছেন সেটাই স্যার। "
.
সঞ্জয় স্যার তখন টেবিল চাপড়ে বলেছিলেন " ইউ আর অ্যা ডক্টর নিশি,ইউ আর অ্যা ডক্টর। ইউ হ্যাভ নো রাইট টু ডু দিস।"
কোনটাতে কার অধিকার বা অনধিকার আছে তা কখনো পেশা নির্ধারণ করতে পারে না স্যার।
---কি বলতে চাইছো তুমি?
আমি চোখ বন্ধ করলাম। শীতল বাতাস আসছে উত্তরের জানালা দিয়ে। বাইরে খটখট ট্রলি টানার শব্দ শুনছি। আমি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলাম " আমি তখন খুব ছোট,পুতুল খেলার বয়স। মজনু খাঁ আঙ্কেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আরাফ ভাইকে পড়াতেন। তবে ভদ্রলোকের কাছে আরাফ ভাই কখনো পড়তে চাইতো না। বিড়ালছানার মত জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকতো। আঙ্কেল মেরে টেরে পাঠাত উনার কাছে। মাঝে মাঝে যখন ওদের বাসায় যেতাম ওর ঘরে গিয়ে হাত ধরে হ্যাচকা টান মেরে বলতাম " চল না ভাইয়া আমরা পুতুলের বিয়ে বিয়ে খেলি।"
ও তখন ফুঁপিয়ে কেঁদে বলত, " আমাকে ধরিস না নিশি,আমাকে ধরিস না। আমার শরীরে ব্যথা। "
সেই ছোট্ট বেলায় শরীর ব্যথার উৎস আর ফর্সা ধবধবে শরীরে চাকা চাকা জমাট বাধা রক্তের অর্থ আমি খুঁজে পেতাম না কিন্তু বড় হতে হতে বুঝেছি"
---হোয়াট ডু ইউ মিন নিশি? ওয়াজ হি সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজড?
আমি চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়িয়ে কাঁপা গলায় বললাম " ইয়েস স্যার। " কী অাশ্চর্য আমি কাঁদছি কেন?
.
আমার দু পাশে দুজন মহিলা পুলিশ। তাদের চোখে মুখে বিরক্তি। " আমার মেয়ে খুন করতে পারে না " এই বলে মা পথ আটকাবার চেষ্টা করছে। কী মনে করে আমি পেছনের দিকে ঘাড় ঘুরে তাকালাম। রূপবান এক যুবক ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্য। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় সে জল শিশির কণার মত চিকচিক করছে। সেই জল ছুঁয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, "মাই লর্ড, আমি ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকা এক যুবকের কান্নার অর্থ বুঝেছি। আপনি নির্দ্বিধায় আমার ফাঁসির রায় কার্যকর করতে পারেন। আমি হাসতে হাসতে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করব।
.

লিখেছেনঃ Tuffahul Jannat Maria


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 Comments: