গল্প নং: (১২)
নামঃ ফুলের মৃত্যু।
.
'অ্যাবোরশন করবো!' ২৩/২৪ বছরের একটা মেয়ের এমন কথায় চেম্বারের সব ডাক্তার নিজের কাজ ফেলে ঘুরে তাকালো। সরকারি হাসপাতাল, একসাথে চারজন ডাক্তার রোগী দেখছে। সকাল সকাল রোগীর প্রচন্ড চাপ, বাইরে অনেক মানুষ সিরিয়ালে দাড়িয়ে অাছে। গাইনোকোলজি বিভাগের চারজন ডাক্তার রোগী দেখায় তখন বড্ড ব্যস্ত। সেসময় অল্প বয়স্ক মেয়েটির অ্যাবোরশনের কথা শুনে ঘুরে তাকালো চারজনই। মেয়েটির মুখ বিবর্ণ, পরনে ওয়েস্টার্ন ড্রেস, মুখে চিন্তার ছাপ। মধ্য বয়স্কা ডাক্তার মিসেস লুনা জিজ্ঞেস করলো, কয় মাস? মেয়েটি বললো, পাঁচ মাস চলছে। মিসেস লুনা রেগে উত্তর দিলো, পাঁচ মাসে অ্যাবোরশন করা সম্ভব না, অ্যাবোরশন যখন করবেই এতদিন কোথায় ছিলে? মেয়েটি বললো, অামি এতদিন অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোথাও পারিনি, কোথাও অ্যাবোরশন করেনি। অামি অামার প্রেগন্যান্সির কথা জানতে পারি তিনমাসে। এই দুটো মাস অনেক চেষ্টা করেও পারিনি। মেয়েটি এক নাগারে কথা গুলো বলে গেলো। মিসেস লুনা অন্যান্য সব রোগীকে বাইরে যেতে বললো।কারন মেয়েটির হয়তো অনেক গোপনীয় কথা বলার থাকতে পারে। বাকিসব রোগীদের বাইরে যেতে বলে মিসেস লুনা বললো। সব খুলে বলো, এখানে সবাই ডাক্তার। বলো তোমার কথা।
মেয়েটি বললো, অামার কিছু বলার নাই ম্যাম। অামি অ্যাবোরশন করবো। মিসেস লুনা বললেন, অাচ্ছা, অামায় বলো তো তোমার নাম কি? মেয়েটি বললো, তিতির। মিসেস লুনা এবার হাসিমুখে সম্বোধন করে প্রশ্ন করলেন, তিতির তুমি অ্যাবোরশন করতে কেন চাচ্ছো? একটা জীবন কেন নষ্ট করবে, বলো? তিতির বলে, অামি যে এই নতুন জীবনটার কোনো স্বীকৃতি দিতে পারবো না, এর পরিচয় হবে অবৈধ! তিতির কান্নায় ভেঙে পড়লো। মিসেস লুনার টেবিলে মাথা রেখে মেয়েটি কাঁদছে। মাথায় হাত রেখে মিসেস লুনা বললো, তোমার বয়ফ্রেন্ডকে জানিয়েছো তোমার মা হওয়ার খবর? তিতির বলে, ওর সাথে অামার ব্রেকঅাপ হয়েছে তিন মাস অাগে। ও চলে যাওয়ার পর অামি প্রেগনেন্সির ব্যাপার জানতে পারি। ওর সাথে এরপর অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করি কিন্তু ওর কোনো হদিস নেই।
ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে তিতির ঢকঢক করে জল খেয়ে নেয়। তারপর অাবার বলা শুরু করে, প্রেগন্যান্সির খবর জানার অাগেই বাসা থেকে অামার বিয়ে ঠিক করে ফেলে, অামার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ব্রেকঅাপ হয়ে গেলে অামি বিয়েতে মত দেই। কিন্তু অামার ভিতরে তো অন্য একটা জীবন বেড়ে চলেছে। এখন অামি কি করবো?
'এখন অামি কি করবো?' এমন প্রশ্নে এই বিশাল রুমের চারজন ডাক্তারের মুখেই হতাশার ছাপ। তিতির বললো, অামার সামনের মাসে বিয়ে, অামি বাসায় অার মুখ দেখাতে পারবো না, যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। মিসেস লুনা এই চারজন ডাক্তারের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র ডাক্তার। তাই বাকিরা চুপ করে শুনে গেলো, কোনো কথা বললো না। মিসেস লুনা বললো, মান সম্মানের ভয়ে যদি তুমি জোর করেই অ্যাবোরশন করতে গিয়ে নিজের জীবনটাই হারাও তবে কি লাভ বলো?
তিতির বলে, ম্যাম অামি বাঁচতে চাই। স্বাভাবিক জীবন চাই, এ কদিনে অামি খুব অস্বাভাবিক জীবন যাপন করছি। অামি মুক্তি চাই।
মিসেস লুনা বললেন, তোমার বাড়ির লোকের সাথে অামি যদি কথা বলি? তাহলে হয়তো ঠিক একটা রাস্তা বের হবে। তিতির অাঁতকে উঠে বললো, ইম্পসিবল! অামার বাবা এসব শুনলে মরেই যাবে! অামি বাড়িতে কিছুতে এসব জানাতে পারবো না। অাপনি অ্যাবোরশনের ব্যবস্থা করুন।
মিসেস লুনা বললো, তোমাকে অামি এক সপ্তাহের কিছু ওসুধ লিখে দিচ্ছি, তুমি ১ সপ্তাহ পর এসো। তিতির বলে, অাজ কিছু করা যাবে না? ডাক্তার লুনা বলেন, নাহ! অাজ ঝুঁকির হবে খুব।
রুমের বাইরে থেকে খুব চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। রোগীরা অনেকক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করছে। অপেক্ষারত রোগীদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
.
তিতির রুম থেকে বেড়িয়ে সোজা মেইন রাস্তায় চলে গেলো। দিশেহারা ভাবে হাঁটতে থাকলো। তিতির রাস্তা পারাপারের সময় হঠাৎ এক বাস তাকে ধাক্কা দিলো, ছিটকে পড়ে গেলো সে। মাথা ফেটে রক্ত ঝড়লো খুব, অজ্ঞান হয়ে গেলো তিতির। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেয়া হলো, সাহায্যকারীদের মধ্য একজন বললো, মেয়েটির বাড়িতে খবর দিতে হবে। তিতিরের ব্যাগ থেকে ফোন বের করে লোকটি কললিস্টের সবচেয়ে উপরে থাকা নাম্বারে ফোন করে তিতিরের খবর জানালো। কললিস্টের প্রথমে নাম্বারটি ছিলো তিতিরের হবু স্বামী অনিকেতের। হাসপাতালে অাসার অাগে তিতির লাস্ট অনিকেতের সাথে কথা বলেছে।
অনিকেত তিতিরের অ্যাক্সিডেন্টের খবর শুনে হাসপাতালে চলে এলো।
.
তিতিরের জ্ঞান ফিরেছে, এখন সে অাশঙ্কামুক্ত। অনিকেত যখন ডাক্তারের কাছে তিতিরের শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গেলো তখন ডাক্তার তাকে যা বললো সেসব শোনার জন্য অনিকেত প্রস্তুত ছিলো না। ডাক্তার তাকে তিতিরের প্রেগন্যান্সির খবর দেয় এবং বিভিন্নরকম পরামর্শ দেয়। অনিকেত মনে প্রাণে চাচ্ছিলো ডাক্তারের সব কথা মিথ্যো হোক।
তিতিরের বাড়ি যাওয়ার সময় হয়েছে। অনিকেত ওকে ধরে ধরে হাসপাতাল থেকে বের করলো। বাড়ি যাওয়ার পথে গাড়িতে বসে জিজ্ঞেস করলো, তিতির ডাক্তার তোমার প্রেগনেন্সির কথা বললো। খবরটা কি সত্য? অনিকেতের মুখে এই কথা শুনে তিতিরের অাপাদমস্তক কেঁপে উঠলো। ভয় পেয়ে গেলো তিতির। কাঁপা কন্ঠে উত্তর দিলো, হ্যাঁ! সত্যি। অনিকেতের কন্ঠে রাগ অার ঘৃনা! সে বললো, বাচ্চাটার বাবা কোথায়? কে সে? কেন অামাকে ঠকালে? মিথ্যে বলে তুমি অামার ঘাড়ে চেপে বসছিলে? তিতির কোনো জবাব দিলো না। চুপ করে বসে রইলো। অনিকেত অাবার বললো, তোমার সাথে অামার বিয়েটা হচ্ছে না। অার কখনো এমন করে কাউকে ঠকাবে না। তিতির অনেকদিন পর স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলো। বিয়েটা সে করতে চায়নি, বিয়ের জন্যই তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিলো। তিতির বললো, তোমার কাছে একটা অনুরোধ, তুমি অামার বাড়িতে অামার এই অবস্থার কথা জানাবে না। এটুক দয়া অামাকে করো। বাসায় এখন এসব জানলে অামার বাবাকে বাঁচানো যাবে না। অামার পরিবারটা শেষ হয়ে যাবে। অনিকেত বললো, ঠিক অাছে, অামি জানাবো না। তবে বিয়েটা অামি করতে পারবো না। অামার পরিবারের সম্মান অামি নষ্ট করতে পারবো না।
.
এক সপ্তাহ পর যখন তিতির অাবার হাসপাতালে গেলো তখন বেলা ১০ টা বাজে। ডাক্তার ওকে দেখেই বললো, কেমন অাছো তিতির? তিতির জবাব দিলো, ভালো অাছি ম্যাম। একটা সুখবর অাছে! অামার বিয়েটা ভেঙে গিয়েছে। মিসেস লুনা বললো, অাচ্ছা! এখনো কি তুমি অ্যাবোরশন করাতে চাও? তিতির বললো, অ্যাবোরশন না করালে অামি বাচ্চাটার কি পরিচয় দেবো? অামার পরিবারকে কি বলবো? অামি অ্যাবোরশন করবো।
তিতিরের ফোন বেজে উঠলো। তিতির ফোন রিসিভ করতেই ওর চোখমুখ হেসে উঠলো। ফোনের অপরপাশের ব্যক্তির কথায় সায় দিয়ে ফোন রাখলো। তিতির ফোন রেখে দিয়ে মিসেস লুনাকে বললো, ম্যাম অামার চাকরি হয়ে গিয়েছে, রাজশাহীতে পোস্টিং। অ্যাবোরশন হয়ে গেলেই সমস্ত অতীত মুছে নতুন করে জীবন শুরু করবো।
মিসেস লুনা, মেয়েটির মুখের দিকে চেয়ে রইলো। বাঁচার কত তাগিদ, কত স্বপ্ন ওর। ভবিষ্যৎ সুন্দর হবে তো ওর? তিনি মনে মনে স্রষ্টাকে ডাকলো, তাঁর কাছে প্রার্থনা করলো যাতে মেয়েটা সুস্থ থাকে।
.
অাপারেশন থিয়েটারে তিতিরকে নিয়ে যাওয়া হলো, ৫ মাসের একটা ভ্রূণ হত্যা করা হবে। একটা জীবন শেষ করে দেয়া হবে। স্রষ্টা প্রদত্ত একটা নিষ্পাপ জীবনেরও বেঁচে থাকার অধিকার ছিলো, তার বেঁচে থাকার অধিকার তারা হরণ করছে। মা বলে ডাকার অাগেই জীবনটাকে নষ্ট করা হচ্ছে কারণ বাবা বলে সে কাউকে ডাকতে পারবে না। এই জীবনটা বেঁচে থাকলে তাকে সবাই অবৈধ বলবে! তার স্বীকৃতি সমাজে নেই।
.
অপারেশন থিয়েটারে তিতির এখন বেঁটে থাকার লড়াই করছে। সে পুষ্টিহীনতায় ভুগছিলো, শরীরে রক্ত শূন্যতা। ফলে বেঁচে থাকা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, পর্যাপ্ত রক্তের যোগান হাসপাতাল তাকে দিতে পারেনি। অপারেশন থিয়েটার থেকে তিতিরের লাশ বের হয়। নিথর দেহটি হাসপাতালের করিডোরে পড়ে থাকে।
.
সমাপ্ত
-
+
লিখেছেনঃ ফাতেমাতুজ জোহরা নিশি।
Author: Jahid
Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.



0 Comments: