অনুর বিয়ে

গল্প নং: (১৩)
নামঃ অনুর বিয়ে।
-
অনুর বিয়ে হলো এক পুরাতন জমিদার বাড়ীতে।
বিয়ের পর সে সেই বাড়ীতে থাকতে শুরু করে। শহর থেকে কিছুটা দূরে।
নির্জন গ্রামে। চারপাশে বাড়ীঘর তেমন একটা নেই। শুনেছি দশ বিঘা জুড়ে বাড়ীটা।
তবে বাড়ীর অধিকাংশ লোক ই লন্ডন, আমেরিকা, ঢাকা চিটাগাং মোট কথা বাহিরে থাকে।
যে কয়েক ঘর মানুষ বাড়ীতে আছে তাও অনেক অল্প। তাই সন্ধ্যা হতে হতেই বাড়ীটা রুপ নেয় যেন এক মৃত্যু পুরীতে।
যেহেতু বাড়ীটা গ্রামের এক পাশে। আর শহর থেকে অনেকটা দূরে। তাই কারো কোন কিছুর প্রয়োজন পড়লেই ছুটতে হয় শহরে। আর এখানে একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে রিক্সা।
বাড়ীর চারপাশে বিশাল তিনটি পুকুর আছে। আর পুকুরের পাড় ঘেষে ঘন জংগল। পারতপক্ষে, দিনের বেলাতেও অদিকে যেতে কারো সাহস হয় না।
প্রতি রাতেই সেই জংগল থেকে বাচ্ছা শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায় এর কিছুক্ষণ পরেই এক মহিলার নাকি কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। প্রায় প্রতি রাতেই ঘটনাটা ঘটে।
পুকুর পাড়েই বিশাল বাশ ঝাড়। সেখান থেকে কেউ ঢিল ছুঁড়ে মারে। এমন কি অনু নিজেও তা দেখেছে স্বচক্ষে।
অনুর রুমের পাশেই অন্য ফ্ল্যাটের রুমের জানালা। অনুর জানালার ই বরাবর।তবে তারা বাড়ীতে থাকে না।
কিন্তু তাদের জানালার একটা অংশ খোলা রেখে গেছে। সেদিন দুপুরে মাত্র ভাত খেয়ে অনু শুয়েছিলো। হঠাৎ কিসের আওয়াজে যেন অনুর ঘুম ভেঙ্গে গেলো।
অনু কান পেতে শুনতে পেলো পাশের ফ্ল্যাটে কেউ যেন গুনগুনিয়ে গান গাইছে। সেই সাথে পানির ট্যাপ থেকে পানি পড়ার শব্দ আসছে।
অনু ভাবলো হয়তো ওদের কেউ এসেছে। কিন্তু না।
অনু অবাক হলো যখন গিয়ে দেখলো... তাদের মস্ত গেইটে তালা দেয়া।
তবে কি অনু ভুল শুনেছে। এরকম তো হবার কথা নয়।
প্রায় প্রতিদিন অনু এসব গানের আওয়াজ আর পানির শব্দ শুনতে পেতো। সে একদিন খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে তাকালো।
যা দেখলো তা অবিশ্বাস্য। একটা কালো মতন হাড্ডিসার মহিলা উস্কোখুষ্কো চুল সে পানির ট্যাপ ছেড়ে দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে।
অনু অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল।
অনুর এ অবস্থা দেখে তার স্বামী তাড়াতাড়ি অনুকে এনে বিছানায় শোয়ালেন।
অনু বার বার সেই দৃশ্য সবাইকে বলতে লাগলো।
অনু রাতে লাইট অফ করে ঘুমানোর অভ্যেস। এরপর অনু যখনই লাইট অফ করে বিছানায় যেতো সেই মহিলা এসে হাজির হতো। অনুর গায়ের কাপড় চোপড় ধরে টানাটানি শুরু করতো।
অনু ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে সারারাত লাইট জ্বালিয়ে বসে থাকতো।
এভাবে চলতে থাকলে অনু নির্ঘাত পাগল হয়ে যাবে এই ভেবে অনুর স্বামী অনুর চিকিৎসা শুরু করলেন এক পরিচিত হুজুরের মাধ্যমে। এসব নাকি দুষ্টু আত্মা অথবা দুষ্টু জ্বীনের কাজ হতে পারে।
অনুকে তাবিজ, তেল পড়া আর পানি পড়া দেয়া হলো।
দুই দিন অনু ভালোই ছিলো।
কিন্তু এরপর অনুর তাবিজ আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। অনু নিজেও জানে না কি করে অনুর তাবিজ খুলে নেয়া হলো।
এক রাতে অনু খুব চিৎকার করতে থাকলো।
অনুর স্বামী উপায় না দেখে পাশ্ববর্তী এক পরিচিত রিক্সাওয়ালাকে হুজুরের কাছে পাঠালো হুজুরকে নিয়ে আসার জন্য।
কিন্তু... রিক্সাওয়ালা আর ফিরলো না। সকালে তার লাশ পাওয়া গেলো পথের পাশে একটি কবরস্থানে।পরে জানা গেলো সে স্ট্রোক করে মারা গেছে। কিন্তু একজন সুস্থ সবল লোক হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা যাওয়াটা কেমন যেন রহস্যময়।
এরপর ... অনু প্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়ে থাকতো বনের ভেতর,পুকুরের সিড়ির নীচে থেকে খুঁজে অনুকে বের করা হতো। তখন অনু একদমই অন্য অবস্থায় থাকতো।দাতে দাত লেগে থাকতো।
অনেক তাবিজ তুমার,ডাক্তার দেখিয়েও অনুকে ঠিক করা গেলো না।
অনেকেই এসব ঘটনার ইতিবৃত্ত জানতো।
যেসব কাহিনী প্রচলিত ছিলো তা থেকে
পরে জানা যায়... বন থেকে যে শিশু আর মহিলার আওয়াজ শুনা যেতো তার কারণ হচ্ছে... অনুর দাদা শ্বশুর তখনকার জমিদার ছিলেন।
খুব প্রতিপত্তি আর ক্ষমতার মালিক ছিলেন তিনি।
তখনকার আমলে
এই জমিদার বাড়ীর সামনে দিয়ে যেসব জনসাধারণ যাতায়াত করতেন তারা পায়ের জুতো খুলে তারপর এই বাড়ী পার হতেন।
তিনি বিভিন্ন সময়ে অনেক মেয়েকে এনে নিজ প্রাসাদে তাদের সাথে রাত কাটাতেন।
এমনি এক গরীব ঘরের সুন্দরী মেয়েকে এনে রেখেছিলেন তিনি নিজের মনোরঞ্জনের জন্য।
কিন্তু সেই মহিলা প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়েছিলো।
যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিলো মহলে। এসব দাসীদের কোনভাবেই প্রেগন্যান্ট হওয়া যাবে না। এরা শুধু মনোরঞ্জনের জন্য।
সেই মেয়ের প্রেগন্যান্টের খবর শুনে জমিদার তাকে হত্যার নির্দেশ দেন।
সেই অবস্থায়ই তাকে হত্যা করা হয়। এর পর তাকে সেই বনে দাফন করা হয়।
কেননা জমিদার দের কবরস্থানে এসব দাসীদের কবর দেয়া হতো না।
আর যে মহিলাকে অনু দেখেছে।
অনুর বর্ননা অনুযায়ী সেই মহিলা ছিলো জমিদারের ধোপার মেয়ে। খুব ই সুন্দরী।
নাচ গান জানতো। একদিন প্রাসাদে কাপড় নিতে আসলে জমিদারের নজর পড়ে সেই মেয়ের উপর।
জমিদার ধোপাকে খবর পাঠায় তার মেয়েকে নিয়ে যেন প্রাসাদে যায়।
ধোপা বুঝে গিয়েছিলো জমিদারের কুমতলব। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো ভোর হবার আগেই এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবার।
জমিদার তা জানতে পেরে রাতেই তার বাহিনী পাঠিয়ে ধোপার ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়।
ধোপা আর তার স্ত্রী প্রাণে বাঁচলেও ধোপার মেয়ে ঘুমে থাকায় সে সম্পূর্ণ পুড়ে মারা যায়।
ধোপা সেই শোক বুকে নিয়ে গ্রাম ছাড়ে।
সেই মেয়ের আত্মাই মাঝে মাঝে এসে হানা দিতো প্রাসাদে।
অনেকে দেখেছে আর আফসোস করেছে।
কিন্তু আজ এতো বছর পর কেন অনুর সাথে এমন করছে। সবার মনে প্রশ্ন।
এদিকে অনুকে ডাক্তার দেখিয়ে জানা গেলো অনু প্রেগন্যান্ট।
তাই হয়তো অনুর উপর প্রতিশোধ নিতে চাইছে।
এরপর অনুর স্বামী অনুকে নিয়ে শহরে চলে গেলেন। সেখানে এক আধ্যাত্মিক হুজুরের শরণাপন্ন হলেন।
অনুকে অনেক কিছু মেনে চলার পরামর্শ দেয়া হলো।
অনু আপাতত এখন ভালোই আছে।
আর সবচেয়ে সুখবর অনু একটি সুন্দর ফুটফুটে ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে।
-
লিখেছেনঃ লাবন্য ইসলাম।


SHARE THIS

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 Comments: